সাম্প্রদায়িকতার আতুরঘর | বিডিপ্রেস এজেন্সি

লেখকের ছবি।

প্রসাদ ফণী রতন : মানব জনমের পর শিশু গড়ে উঠে একটা পরিবেশের মধ্য থেকে। নিজ গৃহ হতে পর্যায়ক্রমে পাড়া মহল্লা, প্রতিবেশী, বিদ্যালয় -অতঃপর দেশের পরিমন্ডলের মধ্য দিয়ে। জন্মের সময় সে মানুষ হয়ে জন্মে। আস্তে আস্তে নানান পরিবেশের মধ্য দিয়ে সে বেড়ে উঠে।সেই পরিবেশই তার আচার আচরণ, স্বভাব চরিত্র, হিংস্রতা ভদ্রতা ইত্যাদি সকল ভাল মন্দ গুনাবলী উপরই নির্ভর করে একটি শিশু বড় হয়ে সত্যিকারের একজন আদর্শ মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে, নাকি ধর্মান্ধ, হিংস্র, সন্ত্রাসী হয়ে উঠবে। বড় হয়ে যে যেভাবে গড়ে উঠবে সেখান পরিবর্তন করা খুব মুশকিল।

সেই জন্য ভালো মানুষ, মানবিক মানুষ, অসাম্প্রদায়িক মানুষ গড়ে তুলতে হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্ব অপরিসীম। ড্রেন পরিস্কার না করে শুধু মশা নিধন করলে সাময়িক মশা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু উৎপত্তি স্থল থেকে আবার মশা জন্ম নেবে। সুতরাং সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতা জিইয়ে রেখে, অপসাংস্কৃতির সাজে সজ্জিত করে, ভোগবাদী রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করে, শিক্ষাক্ষেত্রে গনমুখী শিক্ষার পরিবর্তে পশ্চাৎপদ শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রেখে অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠিত করা, আদর্শবাদী মানুষ চাইলেতো পাওয়া যাবে না। লেবুর গাছ লাগিয়ে আপেল চাইলে তো পাওয়া যাবে না।

সুতরাং যতই আমরা সত্যিকার মানুষ হয়ে গড়ে উঠার কথা বলি,শাসন গর্জন করি- সাময়িক নিরসন হলেও বর্তমান এই সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ঐ সব জীবাণু থেকেই যাবে এবং ক্রমান্বয়ে আবার বিস্তার লাভ করবে। তার উদাহরণ আমরা প্রায় দিনই খবরের কাগজ খুললেই দেখতে পাই। যে বিষয় নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করব সেখানে আসি। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মন্দির, প্যাগোডা, গির্জা ভাংচুর, প্রতিমা ভাংচুর কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

এগুলো পরিকল্পিত ঘটনা। দাঙ্গা বাধাতে হবে তাই একটা ছুতনা খোজা। তাই নিজ ধর্মগ্রন্থ নিজ হাতে অন্য সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে রেখে নিজে পাপ কাজ করে অন্য সম্প্রদায়ের উপর দায় চাপানো এবং সোশাল মিডিয়া এমন কি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোক জড়ো করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়ীঘর,প্রতিষ্ঠান, মন্দির উপাসনালয় ভাংচুর লুটপাট করাকে যদি কেউ বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে তবে তাকেও আমি অপরাধী বলব। কষ্ট লাগে তখনই যখন দেখি বড় বড় দলের তথাকথিত নেতা কর্মীরা এই দাঙ্গা প্রতিরোধে এগিয়ে না এসে ঘটনা ঘটার পর কুম্ভিরাস্রু ফেলে প্রলেপ দেওয়ার কথা বলে বলে মুখের ফ্যানা তুলে ফেলে।

এটা সম্পুর্ন একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যার বীজ বপন হয়েছিল পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ডের পর সামরিক সরকারের দ্বারা সংবিধানকে বলৎকার করে। আর দৃশ্যমান শুরু হয়েছিল আশির দশক থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে। পরবর্তীতে নব্বই দশকে বিস্তার লাভ করেছিল এবং ক্রমান্বয়ে নাসিরাবাদ, সুনামগঞ্জ, রামু,কক্সবাজার, ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া,সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, পীরগঞ্জ,ভোলা,কুমিল্লা, নওগাঁ মাগুরা ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় সংক্রামিত হয়, এখনো হচ্ছে। এমনকি পীরের মাজার,ময়মনসিংহের শোলাকিয়া জামাত, কাদেয়ানী সম্প্রদায়, লালন শাহ মেলায়ও সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটায়। এই ঘটনা গুলো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের আমলেই ঘটেছে, ঘটছে।

এই সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলো নিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপির মতো বড় দলগুলো ব্লেম গেম খেলছে, একে অপরের উপর কাঁদা ছোড়াছুড়ি করছে।মধ্যে থেকে আসল অপরাধীরা অন্ধকারে ডুব মেরে চলে যায়। অপরাধের তথ্য প্রমাণ খুজতে খুজতে দিনের পর দিন চলে যায় – তথ্য প্রমাণ তদন্তের চাদরে ঢাকা পরে যায়। পরে আবার সেই তদন্ত রিপোর্টের পোস্ট মোটম করতে হয়।বিগত কোন সরকারের আমল থেকে এ পর্যন্ত কোন অপরাধের শাস্তি হয় নি। অপরাধ করে দিব্বি মেজাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে, নতুন অপরাধ করার স্পৃহা সৃষ্টি হচ্ছে।

এমনকি লুটপাটের অর্থ বিনিয়োগ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলের মনোনয়ন পেয়ে মেম্বার চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছে, জেলা উপজেলার নেতার চেয়ারও দখল করেছে আওয়ামী লীগ বিএনপি সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির কথার ফুলঝুরি দিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি যে পিরিত দেখাছে- কিন্তু দেখলাম না ঐসব আক্রান্ত এলাকায় কোন নেতাকর্মীদের দল বেঁধে প্রতিরোধ করার জন্য এগিয়ে আসতে। ভাগ-বাঁটোয়ারার কোন ঈসু হলে দলে দলে কর্মী জমা হতো কেউ বঙ্গবন্ধুর ছবি অংকিত ফ্যাটা মাথায় বেধে, কেউ জিয়াউর রহমানের ফ্যাটা পড়ে। আসলে বেশী ভাগেরই অন্তরে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিলীন হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে।

কারণ একটাই- সাম্প্রদায়িকতার জীবাণু জন্ম নেওয়ার ক্ষেত্র জিইয়ে রেখে অসাম্প্রদায়িক লোক পাওয়া মুশকিল। আগেই বলেছি ড্রেন মেরামত করে পরিস্কার না করে শুধু স্প্রে করে মশা মারলে সাময়িক মশা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, কিন্তু স্থায়ীভাবে কাজ হয় না। আমাদের বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূল স্তম্ভ সংবিধানে ধ্বংস করে অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতাকে হত্যা করে সেই স্থানে পাকিস্তানি আদলে রাষ্ট্রীয় ধর্ম সহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানি তকমা লাগিয়ে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে দেশ পরিচালনা করে মানবিক মূল্যবোধ, নীতি আদর্শ এই সমস্ত চেতনা সমৃদ্ধ করার গুনাবলী ধ্বংস হয়ে গেছে।

আর এই বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে বেড়ে উঠেছে কয়েকটি প্রজন্ম। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মুখরোচক কথা মালা বর্ননা করে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয় না বা হলেও সাময়িক। অহরহ এমন মুখরোচক কথা বলা হচ্ছে সব দল থেকে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক মানসিকতা গড়ে উঠার যে পরিবেশ, যে ক্ষেত্র তৈরী হয়েছে পঁচাত্তর পরবর্তী সময় থেকে তা নিয়ে কোন দলেরই মাথা ব্যাথা নেই। এমন কি আওয়ামী লীগ দীর্ঘ তিন মেয়াদে সরকারে থেকেও বাহাত্তরের সংবিধানের ভূলুণ্ঠিত অংশগুলো মেরামত করার পরিবর্তে বিএনপি কোথায় কি বলল,কিভাবে বিএনপিকে চলতে হবে, বলতে হবে ইত্যাদি নানাবিধ প্রেসক্রিপশন দেয়।

কিন্তু নিজের দলের নেতাকর্মীদের কি ভাবে চলতে হবে, বঙ্গবন্ধুর জীবন চরিত কি, দর্শন কি ইত্যাদি বিষয়ে কোনো কর্মশালা করে না। ভোগবাদী রাজনীতিতে নিমজ্জিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে আস্তাকুড়ে ফেলে ভোটের রাজনীতির হিসাব কষে মৌলবাদীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পাঠ্যবই , শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অঙ্গন সহ সর্বত্র ধর্মান্ধ, কুসংস্কার, অদৃষ্টবাদী, সাম্প্রদায়িক চেতনার ধোঁয়া নিগ্রত করছে। পঁচাত্তর পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম সেই সাম্প্রদায়িক ধোঁয়ায় বেড়ে উঠেছে।

সেই সমাজে বা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অসাম্প্রদায়িক আদর্শ গড়ে উঠবে কিভাবে? ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। ধর্ম গেল ধর্ম গেল অপপ্রচার চালিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ, নির্যাতন লুটপাট চলমান রয়েছে। শুধুমাত্র মশা নিধনের স্প্রে ব্যবহার করার মতো প্রশাসনিক কর্মতৎপরতায় মাঝে মাঝে আক্রমণ নির্যাতন স্তিমিত থাকে।আবার সুযোগমত ছুতা খোঁজে ছোবল মারার জন্য।আমি মনে করি এখনো দেশে শতভাগ মানুষের এমন পদস্খলন হয় নি।

সংখ্যায় কম হলেও তাদের আদর্শিক শক্তি হাজার গুন বেশী। এই জাতীকে এই রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িকতার অন্ধ গহবর থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে আনতে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে খাদ মুক্ত করতে হলে সেই আদর্শিক মেধা সম্পুর্ন রাজনৈতিক শক্তি, যুব শক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে যেমন ভাবে স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচার প্রকৃয়া তরান্বিত করার জন্য শাহবাগে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল এবং সরকারকে বাধ্য করেছিলো আইন সংশোধন করতে।

একটা ভয়ংকর রকমের সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্লাটফর্ম এখনই প্রয়োজন যাতে সরকার বাধ্য হয় সংবিধানের গলদগুলো পরিস্কার করে বাহাত্তরের সংবিধান প্রতিষ্ঠিত করতে। গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলন করতে যেখানে অন্ধ কুসংস্কার থাকবে না, বাস্তবমুখী মুক্তচিন্তা থাকবে। আদর্শবাদী মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে শিশুরা।পরবর্তী প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হয়ে গড়ে উঠার আর বিকল্প নাই। নইলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা পাথর হয়ে যাবে।

এমনিতেই ভাবাদর্শগত ভাবে পাকিস্তানি ভাবধারায় এগিয়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশ পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলায় এখনো অনেকেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জয়গান গায় – এটাই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বাঙালি জাতীয়তাবোধ বিলিন হয়ে গেছে। যদি এই ভাবধারা চলমান থাকে তবে আফগানিস্তানের ভাবাদর্শে নিমজ্জিত হতে হবে। সুতরাং সাবধানী হয়ে সকল শ্রেণীপেশার শুভবুদ্ধি সম্পুর্ন মানুষদের একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এখনই।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। 

বিডিপ্রেস এজেন্সি/নুসহাই

আরও পড়ুন...