সমাজ পরিবর্তন ও সংশোধনে জনগণের পাশে থাকুক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

লেখকের ছবি।

মোঃ কামরুল ইসলাম : অধিক জনগোষ্ঠীর দেশ আমাদের বাংলাদেশ। দেশে প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যা রয়েছে। কেনো জানি আমরা সব সময় নিয়ম ভাঙ্গার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকি। এখানে পেশীশক্তি আর অর্থশক্তির জোরের প্রয়োগ খুব বেশী দেখা যায়। আইনের চেয়ে পেশীশক্তি আর অর্থশক্তিকে সমীহ করার প্রবণতাও দেখা যায় খুব বেশী। একটা প্রবাদ আছে “শক্তের ভক্ত নরমের যম”। প্রতি মূহূর্তেই এর প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায়।

আমরা কি নষ্ট হয়ে গেছি নাকি পচে যাচ্ছি? কে সামলাবেন এই সমাজ? কে নিবে দায়িত্ব এই সমাজ সংশোধনে? কিভাবে অগ্রসর হবে এ সমাজ, এ দেশ? প্রতিদিনই কোনো না কোনো অপকর্ম ফলাও করে প্রচার হচ্ছে। কমছে কি এসব অপকর্মের? বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারীতে তটস্থ, এর থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে সবাই, সেখানে আমাদের দেশে কিছু উচ্ছিষ্ট প্রজাতি করোনাভাইরাসকে পুঁজি করে অনৈতিক ব্যবসা করে সমাজকে আতংকগ্রস্ত করে তুলেছিলো। আইন শৃংখলা বাহিনী দেরিতে হলেও তাদেরকে দমন করতে পেরেছে। সাহেদ, সাবরিনা, পাপিয়াদের মতো চরিত্র যতদিন এ সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকবে ততদিন এ সমাজের বিপদ সংকুলান হবে না।

ডা. সাবরিনা, ডা. ঈশিতা জীবন রক্ষাকারী পেশাটাকে কালিমা লেপন করে কোন্ স্বর্গীয় সুখানুভূতি পেতে চেয়েছিল? এই নষ্টের বটবৃক্ষগুলো কি একদিনেই তৈরী হয়েছে? এই নষ্টের ছায়াতলে হাজারো নষ্ট গজিয়ে উঠছে প্রতিমূহূর্তে। নষ্টগুলোকে সমূলে উৎপাটন করার কি কোনো উপায় নেই? আমরা গর্ব করে বলি আমাদের আইন শৃংখলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা অনেক বেশী মেধা সম্পন্ন। তাদের সুচতুরতায় তো এসব নষ্টের রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে কি?

হেলেনা জাহাঙ্গীররা তো অনেক বটবৃক্ষের ছায়াতলে আশ্রয় প্রশ্রয়ে থেকে রাজনীতিকে ব্যবসা হিসোবে নিয়ে নিয়েছেন। হেলেনা জাহাঙ্গীরের মতো চতুর্থ-পঞ্চম সারিতে অবস্থান করা কোনো নেতা কিংবা নেত্রী যদি বলে উঠে বাংলাদেশের মন্ত্রী গোনার সময় নেই, তা সত্যিই চিন্তিত হওয়ার বিষয়।

একটু ভাবুন তো সেসকল নেতা বা নেত্রীর ভিত কতই না শক্ত? দুঃখ হয় এদেশের রাজনীতির, দুঃখ হয় এদেশের রাজনৈতিক নেতাদের জন্য। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এরকম রাজনীতি কি আমরা চেয়েছি? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কি এমন বাংলাদেশ কিংবা এমন রাজনীতি উপহার দিয়েছিলেন? কখনই না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এদেশ স্বাধীন হয়েছিলো। এদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা অপরাজনীতিরই ফসল।

ভুঁইফোঁড় সংগঠন নিয়ে কথা বলেন অনেকেই। প্রত্যেকটি ভুঁইফোঁড় সংগঠনের নেতা কিংবা নেত্রীরা কোনো না কোনো সংগঠনের ছায়াতলেই বেড়ে উঠা পরগাছা। যদি ধরে নেয়া হয় ১০০টি ভুঁইফোঁড় সংগঠন আছে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির ছায়তলে। তাদেরকে যদি প্রধান রাজনৈতিক সংগঠনগুলো স্বীকৃতি না দেয় তাহলে আইন শৃংখলা বাহিনীর মাধ্যমে সমূলে ধ্বংস করা কি অনেক কঠিন কাজ? যদি কঠিন না হয়ে থাকে তবে ধ্বংস করছি না কেনো? তাদেরকে কেনো বাঁচিয়ে রাখছি?

মডেল শব্দটি সাংস্কৃতিক অংগনে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। একবার যদি কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে মিডিয়ায় উপস্থিত হওয়া যায় তবে সারাজীবনই মডেল উপাধি নিয়েই পার করে দেয়া যায়। এখানেও কোনো নীতিমালা আছে কিনা জানা নেই। নামের আগে প্রফেসর, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ডক্টরেট ইত্যাদি কত সাধনার ফসল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নামের আগে মডেল বসিয়ে নিজেকে সুপিরিয়র ভাবতে থাকে অনেকেই। যার জন্য তৈরী হতে থাকে মডেল মৌ, মডেল পিয়াসা। এরা তো সমসাময়িক ঘটনার ফসল।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে হরহামেশাই দেখি মডেলদের নিয়ে নানা মুখরোচক গল্প। মডেলিং একটা পেশা হিসোবেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বেঁচে থাকুক। মডেলের নামে নষ্টের যেন ছড়াছড়ি না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টিপাত করা উচিত। না হলে এ পেশাটাই নষ্ট পেশা হিসাবে সমাজে স্থান করে নিবে। নব্বইয়ের দশকে দেখেছি বিবি রাসেল, নোবেল, সাদিয়া ইসলাম মৌ, সুবর্না মুস্তফাদের মডেলিংয়ে অনেক পণ্যের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন দেখার জন্যও দর্শকের অভাব হতো না। আগ্রহের জায়গা ছিলো টিভি বিজ্ঞাপন। কোনো প্রোগ্রাম শুরু হলে বিজ্ঞাপনের সময় দর্শক টিভি সেটের সামনে বসে থাকতো আর খবর শুরু হলে উঠে যেতো। আর বর্তমান অবস্থার কথা দর্শক হিসেবে তো সকলেই অনুধাবন করছি।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের সাম্প্রতিককালের আলোচিত নায়িকা পরীমনি কিংবা নায়িকা একার ঘটনাবহুল কর্মকাণ্ড দর্শকদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। বাংলাদেশে একটি চলচ্চিত্র ফেডারেশনও আছে কিন্তু চলচ্চিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষদের পরিচালনা করার দায়িত্ব কি তাদের নেই? অথচ বাংলার চলচ্চিত্রের সাথে জড়িয়ে আছে কবরী, শাবানা, ববিতা কিংবা রাজ্জাক আলমগীর এর নাম। একই চলচ্চিত্রাঙ্গনে বর্তমান অবস্থার কথা চিন্তা করলে ভবিষ্যত নিয়ে সন্দিহান হয়ে যাই।

বাংলাদেশের মতো একটি ছোট্ট দেশে একজন এমবিবিএস পাশ করা ডাক্তার ঈশিতা কি করে বিগ্রেডিয়ার জেনারেল কিংবা কর্নেল পদবী ব্যবহার করে মিডিয়ায় সরব উপস্থিত হয়েছে তা কল্পনারও বাহিরে। তাহলে কি এসব পদ-পদবীও যেকেউ দিনকে দিন ব্যবহার করে যেতে পারবে। আমরা কেনো আসলে প্রশ্রয় দিচ্ছি এইসব নষ্টদের।

সামরিক বাহিনীর যেকোনো পদ-পদবী অনেক সম্মানের। আমরা কোন নষ্টের কবলে পড়লে বিগ্রেডিয়ার কিংবা কর্নেল পদবী ব্যবহার করতেও দ্বিধা করিনা। এসব পদবী ব্যবহার করে সমাজকে বিপদগ্রস্ত করে তুললে এর দায়দায়িত্ব কি শুধু ব্যবহারকারীর উপরই বর্তায় নাকি এর জন্য পারিপার্শ্বিক সমাজ ব্যবস্থা দায় এড়াতে পারে?

অপরাধ দমনে অধিকাংশ সময়েই পুলিশ বাহিনী কিংবা দেশের এলিট ফোর্স র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) সবসময়ই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু প্রায়শই সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়, আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন অপরাধ সংগঠনে সরাসরি জড়িত। গুটি কয়েক সদস্যের অপরাধে গোটা বাহিনী দোষী হবে তা ভাবারও কোনো কারন নেই। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ বাহিনী চাকুরি থেকে বরখাস্ত করছে আবার ব্যবস্থা হিসেবে ট্রান্সফার কিংবা ক্লোজড ও করছে।

শুধু পুলিশ বাহিনী নয় সকল আইন শৃংখলা বাহিনী যদি স্বচ্ছ থাকে, নিরপেক্ষভাবে কাজ করে তবেই এ সমাজ ব্যবস্থা অপকর্ম থেকে দূরে থাকবে। একটি জেলায় যদি পুলিশ প্রশাসন সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, নিয়মনীতির মধ্য থেকে আইন প্রয়োগ করতে পারে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নতি হতে বাধ্য।

আমরা যখন কোনো বিপদে পড়ি তখন প্রথমেই থানা পুলিশের কথাই মনে পড়ে। এই করোনার সময়ে পুলিশ বাহিনীর কর্মব্যস্ততার কথা সবাই জানি। একটি মানবিক সংস্থাতে রূপ নিয়েছিলো। সেই সেবার ধারাবাহিকতা চাই আমাদের আইন শৃংখলাবাহিনীতে। সবকিছুর সমাধানের জন্য একটি নাম্বারই যথেষ্ট তা হচ্ছে- ৯৯৯। অসাধারণ উদ্যোগ, শুধু চাই এর ধারাবাহিকতা।

পুলিশ বাহিনী যেন কারো ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারে ব্যবহৃত না হয়ে বিপদের বন্ধু হয়ে উঠে। যেকোনো সমস্যায় যেন সবার আগে পুলিশ বাহিনীর কথাই মনে পড়ে। সমাজ পরিবর্তনে, সমাজ সংশোধনে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা হোক সর্বাগ্রে।

লেখক : সভাপতি, সাস্ট ক্লাব লিমিটেড।

বিডিপ্রেস এজেন্সি/টিআই

আরও পড়ুন...