সভ্যতার কারিগরদের অসম্মান করে কখনই সভ্য মানুষ হওয়া যায় না

আমরীন মেহবুবা সুলতানা : রোদে পুড়ে,  বৃষ্টিতে ভিজে মরুতৃষা ভর করেছে যার জীর্ণ শীর্ণ  দেহটিতে, আমি সেই খেটে খাওয়া মানুষদের কথা বলছি। রক্তমাংসে গড়া দেহটিতে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট, কিন্তু অনুভূতি প্রকাশের অধিকারটিও যেন তার নেই। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে দেহটি যেন তার শেষ সম্বল। শতকষ্টে, অসুস্থতায় নিস্তার নেই এই মানুষগুলোর। কারণ তাদের প্রতিদিনের কর্মের উপর ভিত্তি করেই তাদের ভাগ্যে খাদ্য জোটে ক্ষুধার জালা তাদের জানান দেয়, ভোগ বিলাসিতা তাদের জন্য দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।

তথাকথিত সভ্য শিক্ষিত সমাজের মানুষ হয়েও যদি আমরা তাদের প্রতি অবহেল,  নিষ্ঠুরতা এবং অত্যাচার বন্ধ করতে না পারি তাহলে আমরা আর যাই হই না কেন সভ্য মানুষ হতে পারিনি। সভ্যতার কারিগরদের অসভ্য বলতে আজ আমাদের দ্বিধা বোধ হয় না।  কিন্তু, তাদের কষ্টের এবং রক্তের বিনিময়ে এই সভ্যতার তিলে তিলে গড়ে উঠেছে তাদের পিঠের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে এই সভ্যতা। তারা ইট ভেঙে ইমারত তৈরী করেছে। কিন্তু, ইট ভাঙতে গিয়ে তাদের হাত বহুবার রক্তাক্ত হয়েছে। প্রতিটা ইটেই তাদের রক্তের দাগ স্পষ্ট।

তাদের উপেক্ষা করে আমরা কখনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো না। এই সৎ, আস্থাভাজন মানুষ গুলোকে অবহেলা করা কখনই উচিত নয়। কারণ, তারা আমাদের অতি আপনজন। তাদের পরিশ্রমের ফলই আমরা ভোগ করছি। কিছু অর্থের বিনিময়ে তারা সারাদিন আপনার কাজ করছেন, তার মানে এই না যে অর্থের বিনিময়ে এই খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষদের আত্মসম্মানও আপনার অধীন। শ্রমজীবী মানুষ খেটে খায় কিন্তু তারা হারাম খায় না। তারা ক্ষুধার্ত অবস্থায়  আপনার খাবার তৈরি করে খাইয়েছে কিন্তু আপনার খাবার না বলে চুরি করে খায়নি।

আমি সেই শ্রমজীবী মানুষের কথা বলছি যে মানুষ বহু মানুষের দামি পোশাক তৈরি করেছে, কিন্তু নিজের সন্তানদের একটা ভালো পোশাক দেওয়ার সামর্থ্য তার হয়নি। আজ গরিবের সন্তান বলে  আপনার বাসায় কাজ করতে এসেছে, কাজে ভুল হওয়ার অপরাধে তার উপর নির্মম অত্যাচারে আপনি  করছেন। কিন্তু আজ আপনি যদি গরিবের সন্তান হতেন তাহলে এই নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে পারতেন? মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব জাগ্রত করতে হবে। আর তীব্র রোদে রাস্তার ধারে বসে থাকা জুতা সারানো মুচির দুইটা হাত কি কখনও লক্ষ্য করেছেন?

ধারালো সুঁচের আঘাতে কেটে যাওয়া চিহ্ন আপনার চোখে পড়বে। এই হাত নিয়ে সারানো জুতা আপনার পছন্দ না হওয়ার ফলে, আপনি তার গায়ে  ছুঁড়ে মেরে বললেন, “এইটা কি সারিয়েছিস, মানুষের টাকা মেরে খাওয়ার ব্যবসা নিয়ে বসে আছিস?” এই বলে তার প্রাপ্য টাকার অর্ধেক তাকে দিলেন। কিন্তু, আপনি এই মানুষটার হকের টাকা থেকে তাকে বঞ্চিত করলেন।

কিন্তু আজ যদি এই মুচি না থাকতো, তাহলে আপনার নিজের জুতা নিজের সারাতে হতো। আজ মুচি বলে যাকে অবহেলা করছেন, সেই কাজটি যখন আপনি করবেন তখন আপনিও কিন্তু সেই উপাধিটি পাবেন। সে মুচি হতে পারে কিন্তু তার মধ্যে সততার যেই শিক্ষা রয়েছে, আপনি শিক্ষিত  মানুষ হয়েও সেই শিক্ষা অর্জন করতে পারেননি। মানুষকে সম্মান করতে শিখুন। শ্রমজীবী বা খেটে খাওয়া মানুষের টাকা খেয়ে আপনি কখনোই বড় হতে পারবেন না। যাদের ছাড়া আমরা তথা আমাদের সমাজ অচল,  তাদের অবহেলা করতেও তো লজ্জাবোধ হওয়া উচিত। তাদের ভালবাসতে এবং শ্রদ্ধা করতে শিখুন।

শিক্ষিত সমাজের এই  নির্মম কর্মকাণ্ড কখনোই কারো কাম্য হতে পারে না। সভ্য সমাজের কারিগরদের উপেক্ষা করলে একদিন এই সমাজ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে। আপনার জন্মের সময় উপস্থিত নার্স  থেকে শুরু করে মৃত্যুর পরে কবর দেওয়া পর্যন্ত মানুষগুলোর  অবদান আপনার জীবনে অনস্বীকার্য। এই শ্রমজীবী মানুষ গুলোর প্রতিদান আপনি কখনো অর্থের বিনিময় পরিশোধ করতে পারবেন না।

আজ আপনি  অর্থের অহংকার আর গর্বের সহিত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন কিন্তু ভুলে যেয়েন না এই শ্রমজীবী মানুষদের পিঠের উপর ভর করে দাঁড়িয়েই আজ আপনার এত অহংকার। কিন্তু এই শ্রমজীবী মানুষ যদি উঠে দাঁড়ায় তাহলে আপনি মাটিতে লুটিয়ে পড়বেন এবং আপনার এই মিথ্যা অহংকার আর গর্ব চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। শ্রমজীবী মানুষদের প্রতি সম্মান এবং শ্রদ্ধা কেবল বছরে একটি দিন নয়, তাদের প্রতি সম্মান এবং শ্রদ্ধা চিরস্থায়ী।

লেখক : তরুণ কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী।  

বিডিপ্রেস এজেন্সি/ইবতিশাম পুলক

আরও পড়ুন...