শুধুমাত্র ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড নয়, জুলুম-নির্যাতনের দাফন ‘আবশ্যক’

প্রতিকী ছবি। 

আমরীন মেহবুবা সুলতানা : সমাজে বসবাসকারী মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অবক্ষয়ের অন্যতম বাস্তব চিত্র হলো ধর্ষণ। কিন্তু এই অপরাধ কোন বয়স সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সারা পৃথিবীতেই ধর্ষণ প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। নানা ধরনের আইন প্রয়োগ করেও বন্ধ করা যায়নি এই অপরাধকে। কিন্তু এই অভিশাপ থেকে সমাজ তথা দেশ মুক্তি না পেলে শান্তি প্রতিষ্ঠা কখনোই সম্ভব নয়। ধর্ষক সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ। সবাই এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার কিন্তু শুধু ধর্ষক বিরোধী আন্দোলন বা ব্যবস্থায় কি যথেষ্ট এদের সমাজ থেকে দূর করার জন্য? যদি আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে একটি গাছের সাথে তুলনা করি, আর ধর্ষকদের সেই গাছে উৎপন্ন প্রকার সাথে তুলনা করি। তাহলে আমরা এই গাছের পোকা নিরসনের জন্য যতই কীটনাশক ব্যবহার করি না কেন এতে কোনো স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবেনা। হয়তো সেই সময়ের সব পোকা মারা যাবে।

কিন্তু পরবর্তীতে আবার উৎপন্ন হবে, আবার ধীরে ধীরে পুরো গাছে ছেয়ে যাবে। আক্রান্ত পাতা ফেলে দিলে বা ওষুধ প্রয়োগে যেমন এদের স্থায়ীভাবে নিরসন সম্ভব নয় ঠিক তেমনি শুধু আইন প্রয়োগে বা আন্দোলন করে সমাজকে সম্পূর্ণরূপে ধর্ষক মুক্ত করা সম্ভব নয়। ধর্ষকের উৎপত্তি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে পারলেই সমাজ এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে। সমাজে নারী পুরুষের সমান অধিকার থাকলেও সবকিছুতেই পুরুষকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ছেলে বা মেয়ে শিশুর মধ্যে বৈষম্য দেখা যায়। যার ফলে আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পরিণত হয়েছে। এই বৈষম্যের কারণে পুরুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেছে। এই বৈষম্য অবহেলা বিভেদ আমরাই সৃষ্টি করেছি। ধর্ষণের প্রতিকার না প্রতিরোধ প্রয়োজন।

কিন্তু এই ধর্ষণ হঠাৎ করে আমাদের সমাজে আসেনি। আধিপত্য, অন্যায়, অত্যাচার এবং অবহেলার চূড়ান্ত রূপ হিসেবে ধর্ষণ সমাজে এসেছে। তিন শ্রেণীর মানুষ সমাজে বিদ্যমান , দুই শ্রেনীর মানুষ সমাজে স্থান পেলেও তৃতীয় শ্রেণীর মানুষরা সমাজে অবহেলিত ও নির্যাতিত। তিন শ্রেণীর মানুষ এক হতে না পারলে জুলুম অত্যাচার বন্ধ করা সম্ভব না। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর না যায় তাহলে এক শ্রেণীর মানুষের উপর অপর শ্রেণীর মানুষের নির্যাতনের চিত্র বদলানো যাবে না। আমরা সমাজে একসাথে বসবাস করলেও সকলের অবস্থান একই নয়। যেমনঃ আমাদের সমাজে মা বাবারা তাদের সন্তানদের নানা বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান দেন। কিন্তু তাদের শিক্ষা দেন না যে কোন হিজড়াকে দেখলে সাহায্য করো।

পানি খাবার চাইলে তাদের দিও। তাদের সম্মান করে কথা বলো। শেখানো হয় তাদের থেকে দূরে থাকবে, যদি কোন কিছু চায় দিবেনা। ওদের সাথে কথা বলবে না মিশবে না। একটা ছোট বাচ্চাকে শেখানো হয় মানুষকে কিভাবে অবহেলা করতে হয় অন্যায় করতে হয়। অন্যায়-অত্যাচারের শিক্ষা যদি আমরা ছোট থেকে দেই তাহলে বড় হয়ে তার মধ্যেই অপরাধ প্রবণতা অনেক হারে বেড়ে যাবে। কিন্তু আমরা এইটা কখনো ভেবে দেখে না যে, ধর্ষণের চেয়েও অনেক বেশি অন্যায় সমাজের ওই শ্রেণীর মানুষের ওপর আমরা করছি।

শিক্ষিত সমাজের মানুষ যদি বিকৃত মন-মানসিকতার নিয়ে চলে তাহলে আর যাই হোক জুলুম অত্যাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে না। সমাজের এক শ্রেণীর মানুষের উপর অমানবিক অত্যাচারের ফলে, বাকি দুই শ্রেণির মানুষ সমাজে একে অপরের উপর জুলুম করছে। নারীর প্রতি এই জুলুম বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং সমাজে নারীকে অর্থের বিনিময়ে পন্যর মতো ব্যবহার করা। যদি আমরা ধর্ষক মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে, ধর্ষণ নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
প্রথমে আমাদের কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং পরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

প্রধান কারণ সমূহ :

১| সমাজের ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বৈষম্য।

২| সমাজের একশ্রেণীর মানুষের উপর জুলুম প্রতিষ্ঠা করে মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা সৃষ্টি হওয়া।

৩| মিডিয়া জগতে নারীকে ভোগ্যপণ্যের মতো উপস্থাপন করা।

৪| প্রকৃত শিক্ষা ও নীতি নৈতিকতার অভাব।

৫| বিভিন্ন জায়গায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব।

৬| নারীর অশ্লীল ও বেপরোয়া চলাচল করা।

৭| অল্প সময়ে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বাস্তবে রূপ দেওয়ার অভাব।

 প্রতিরোধ সমূহ :  

১| সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেকটা মানুষ স্বাধীনভাবে সমাজে বসবাস করবে। লিঙ্গের উপর ভিত্তি করে তার অবস্থান নির্ধারণ করা যাবে না।

২| নারী-পুরুষ সকলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে হবে। যেমন: কোন জায়গায় যদি কারো সাথে ইভটিজিং করা হয় সেই জায়গায় অবস্থানরত সকলের প্রতিবাদী হতে হবে এবং বাধা দিতে হবে।

৩| মিডিয়া জগতে নারীর পণ্যের মত উপস্থাপন অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। যেমন: সিনেমাগুলোতে নারীকে নাইট ক্লাব গুলোর অশ্লীল পোশাক অঙ্গভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়, যা, নারীর মর্যাদা ক্ষুন্ন করে।

৪| তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের উপর অবহেলা অত্যাচার নয় বরং তাদের সঠিক ব্যবহার আমাদেরকে জুলুম অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন : সরকারিভাবে যদি হবে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিরাপত্তার কাজে নিয়োগ দেওয়া যায় তাহলে আমাদের রাস্তাঘাট নিরাপদ থাকবে।

৫| প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণীর শিশুদেরকে বিদ্যালয় প্রতিরক্ষার সকল কৌশল শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। কারণ নিজেকে রক্ষা করতে এর বিকল্প নেই। যার ফলে তারা নিজের পরিবারের বাকি সদস্যদেরও কৌশলগুলো শিখাতে পারবে।

৬| অল্প সময়ে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বাস্তবে রূপ দিতে হবে।

আমরা চাইলেই আমাদের সমাজটাকে বদলাতে পারি। কিন্তু আমাদের সবাইকে এক হতে হবে। শুধুমাত্র ধর্ষণ নয়, সকল ধরনের অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান নেওয়া উচিত। আর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, এই আইনটি অবশ্যই নতুন দিক উন্মোচন করেছে। তাই আমাদের শ্লোগান হওয়া উচিত, ” আমি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা চাইনা, নারীতান্ত্রিক সমাজও নয়। আমি গণতান্ত্রিক সমাজ চাই”। যেখানে থাকবে না জুলুম, হবেনা অত্যাচার, মুক্তি পাবে মানুষ আর মুক্ত হবে দেশ।

লেখক : এইচএসসি পরীক্ষার্থী,শিক্ষাবর্ষ (২০১৯-২০২০)।  

বিডিপ্রেস এজেন্সি/অনিকেত আহসান

আরও পড়ুন...