শিক্ষা সংকট উত্তরণে ফিরে যাওয়াদের ফেরাতে হবে

লেখকের ছবি।

মোঃ আসাদুজ্জামান : প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর ফের বাজতে যাচ্ছে ক্লাসের ঘন্টা। প্রাণের স্পর্শে আবারো মুখরিত হবে শিক্ষাঙ্গণ। শিক্ষার্থীরা ফিরবে প্রিয় ক্যাম্পাসে। কিন্তু অতিমারি করোনা এবং আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে কতজন অভিভাবক তাদের প্রিয় সন্তানদের পাঠাতে পারবেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে- সেই আশঙ্কা কিন্তু থেকেই যায়। আমরা জানি টানা ১৯ মাস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষা খাতে ব্যপক ক্ষতি হয়েছে।

তাছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ বেড়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতিও হয়েছে বিপুল। নন-এমপিও বহু শিক্ষক পরিবার পথে বসেছে। অনেকে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন। ব্যায় নির্বাহ করতে না পেরে সারাদেশে প্রায় চল্লিশ হাজার কিন্ডার গার্টেন চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে কলেজ গুলোতে প্রায় ১ বছর এবং বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে দেড় বছরের সেশন জট সৃষ্টি হয়েছে।

দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম এত দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। জাতিসংঘ ও শিশু তহবিল বা ইউনিসেফের গত ২৪ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ এর কারণে স্কুল কলেজ বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। টানা বন্ধের ফলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা স্তর পর্যন্ত ৪ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দেশের বেকারত্বের সংখ্যা বেড়েছে ভয়ংকর হারে। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রম শক্তি জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ (২৯.৮%) রয়েছে যারা না আছে পড়াশুনায়, না আছে কোন কর্মে, না কোন প্রশিক্ষণে। আবার এদের মধ্যে প্রতি দশ জনে নয় জনই নারী (৮৭%)। এদের একটা ভাগ যে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী তা সহজেই অনুমান করা যায়। ২০২১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তি হওয়া একজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায় যে, তারা একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সময় মোট শিক্ষার্থী ছিলো ১৮৪ জন অথচ এদের মাঝে মাত্র ১১৩ জন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেছে। যারা পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে তাদের বেশির ভাগই ছিলো মেয়ে।

গবেষণায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার বিভিন্ন কারণ জানা গেছে। ছাত্রাবস্থায় বিবাহিত ছেলেমেয়েদের বেশিরভাগই (বিশেষত মেয়েরা) ঝরে পড়েছে বলে জানা যায় কিংবা বিয়ের উদ্দেশ্যে অনেকেরই পড়াশুনা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। মেয়েদের ঝড়ে পরার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের পাশাপাশি দারিদ্রতা অন্যতম কারণ যার মুলে রয়েছে করোনার প্রভাব। বর্তমানে ১৫-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩২.৯% বিবাহিত। ২০-২৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ১৫.৫% মেয়েরা পনের বছ পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে করেছে এবং ৫১.৪% আঠারো বছরের আগে বিয়ে করেছে। তাছাড়া করোনাকালীন পাবলিক পরীক্ষায় অটোপাশের আশায় থাকতে থাকতে একাংশ শিক্ষার্থী পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে।

প্রাক-প্রাথমিককে বলা হয় শিক্ষার বেইজমেন্ট। এনসিটিবিতে প্রেরিত পাঠ্যপুস্তুকের চাহিদা পত্র থেকে জানা যায়, পাঠ্যপুস্তুকের চাহিদা গত বছরের তুলনায় এবছর অনেকটা কমেছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের অনেক পিতা মাতা বা অভিভাবক কর্মহীন হয়ে পড়ায় তাঁদের জীবন জীবিকা চালানো এতটাই কষ্টকর যে সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে তারা ভাবতে পারছেন না।

অনেকেরই কাজ-কর্ম ও চাকরি-বাকরি না থাকায় পরিবারসহ গ্রামে ফিরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আশঙ্কার কথা হলো প্রাক-প্রাথমিকেই যদি শিক্ষার্থী ঝরে পরে তাহলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ। আমরা জানি “শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড।” আর এ মেরুদন্ডই যদি দুর্বল হয়, জাতির ভবিষ্যৎ কী হবে তা সহজেই অনুমেয়। তাই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়াবে। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় –

১। সকলকে সম্মালিত ভাবে কাজ করতে হবে।
২। কর্মহীন অভিভাবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
৩। প্রাতিষ্ঠনিক কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।
৪। বেসরকারী/ননএমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহকে বিনা সুদে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করতে হবে।
৫। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অধিকতর সচেতনতা মূলক ব্যবস্থা গ্রহন ও প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।
৬। শিশুশ্রমকে নিরুৎসাহিত করতে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
৭। পাঠদানকে আনন্দদায়ক করতে পরীক্ষাভীতি দূর করতে হবে।
৮। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে এবং পুরষ্কার প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে বিদ্যালয়মুখী রাখতে হবে।
তাহলেই হয়তো শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া বা ফিরে যাওয়াদের ফেরানোর পথ অনেকটা সহজ হবে।
লেখক : অধ্যক্ষ, বি সি আই কলেজ, সদস্য সচিব, নন-এমপিও কলেজ টিচার্স এসোসিয়েশন। 
বিডিপ্রেস এজেন্সি/অনিকেত

আরও পড়ুন...