শামুকখোল পাখির এক অনন্য মিলনমেলা

গাছজুড়ে শামুকখোল পাখি দৃষ্টি ফেলছে চারিদিকে। ছবি : বিডিপ্রেস এজেন্সি।

জিয়াউদ্দিন লিটন,বিডিপ্রেস এজেন্সি,বগুড়া : বাংলাদেশের প্রকৃতি নানা প্রজাতির পাখিদের কাছে মাতৃস্নেহতুল্য। অর্থাৎ মা যেভাবে সন্তানদের খাদ্যসম্ভার, নিরাপত্তা দিয়ে বড় করে তুলেন, তেমনি। তাই তো ঋতুবৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলাদেশে অসংখ্য পাখির কলরব শোনা যায়। কিছু কিছু পাখিকে আবার বিজ্ঞানীরা তার প্রিয়খাবারের সাথে সংগতিরেখে নামকরণ করেছেন। তেমনি একটি বিশেষ পাখি নিয়ে আমার আজকের লেখা। বাংলার কাদাময়, জলময় প্রকৃতির সাথে এ পাখিটি মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। এর নাম ‘এশীয় শামখোল’। ইংরেজিতে Asian Openbill বলে। শামুকখোল বা এশীয় শামুকখোল এ দুটি বাংলা নামেও তাকে কেউ কেউ উল্লেখ করে থাকেন।

শামুকখোল দেখতে বকের মতো হলেও বেশ বড়। গায়ের রঙ ধূসর সাদা। এরা বাংলাদেশের বড় জলচর পাখিদের একটি। ৬৮ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। প্রতিটা পাখার দৈর্ঘ্য চুয়াল্লিশ সেন্টিমিটার। ঝাঁক বেঁধে চলে। একেক ঝাঁকে ৪০ থেকে ৬০টি পাখি থাকে। জলচর পাখি। নদী, হাওড়-বাওড়, মিঠাপানির জলাশয়, হ্রদ, ধানক্ষেত ও উপকূলীয় বনে এদের দেখা যায়। এদের দেহের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ঠোঁট। ইয়া বড় আর ভারী ঠোঁট। চৌদ্দ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। দুই ঠোঁটের মাঝখানে ফাঁক থাকে। তবে বাসা বাঁধার সময় শরীর একদম সাদা হয়ে যায়। লেজ ও পাখার শেষভাগ কালো রঙের।

আবাসিক জলচর পাখি এশীয় শামুখোল। এশীয় শামুকখোল শামুক খেতে খুবই ভালবাসে। একটা শামুক পেলে ঠোঁট দিয়ে শামুকের খোল ভাঙে। তারপর সেটা ওপরে তুলে আকাশের দিকে মুখ করে গিলে ফেলে। এজন্য এর নামকরণ ‘শামুকখোল’। তবে এরা শুধু শামুকই খায় না। মাছ, কাকড়া, ছোট ছোট প্রাণী, ব্যাঙ ইত্যাদিও খায়। এরা যেসব এলাকায় থাকে সেসব এলাকা বিরাট একটা কলোনি গড়ে তোলে। একেকটা বড় গাছে একটা করে ঝাঁক বাস করে।

তবে গাছ যদি আরও বড় হয় তবে ঝাঁকও অনেক বড় হয়। একবার খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, বগুড়ার বিহার হাটের দুটি অশ্বত্থ গাছে প্রায় ৪০০ পাখি বাস করে। এরা সারাবছর একই জায়গায় কাটিয়ে দেয়। তবে খাবারের অভাব হলে অন্য জায়গায় চলে যায়। বাসা বাঁধার সময় এরা পানকৌড়ি ও বকের সাথে বিরাট কলোনি গড়ে তেলো।

কলোনিতে বাস করার কারণ হলো বাচ্চাদের নিরাপত্তা। চিল, বাজ পাখি, কাক কিংবা মানুষ এদের ছানাদের ক্ষতি করতে এলে ঝাঁকবেঁধে তেড়ে আসে। বড় পাখিদের বাসাও বড় হয়। বড় বড় আমগাছ, শিমুলগাছ, বট ও অশ্বত্থ গাছের উঁচু ডালে বাসা বাঁধে। এক একটা গাছে ২০ থেকে ৩০ বাসা দেখা যায়। কোনো কোনো গাছে একশোরও বেশি বাসা থাকে। গাছের শুকনো ডাল, কঞ্চি ও লতাপাতার সমন্বয়ে বাসা তৈরি করে শামুকখোল পাখি।

স্ত্রী ও পুরুষ পাখি মিলে দশ-বারোদিন ধরে বাসা তৈরি করে। বাসার দৈর্ঘ্য পাঁচফুট পর্যন্ত হয়। জুলাই-আগস্ট মাসে তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। ডিমের আকার মুরগির ডিমের চেয়ে বড়। স্ত্রী-পুরুষ পাখি দুজন মিলে ডিমে তা দেয়। ২৫ দিন লাগে ডিম ফুটে ছানা বেরুতে। ৩০ থেকে ৩৫ দিন বয়স হলে ছানারা উড়তে শেখে।

সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেবার দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ। তবে প্রাকৃতিক জলাভূমি ধ্বংস করে কৃত্রিম মাছের খামারসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরিতে তাদের বিচরণভূমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে কমেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এই প্রজাতির ‘ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত’ বলে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দারুণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়ীদহ ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে বাসা বেঁধেছে বিরল প্রজাতির এই শামুকখোল পাখি। গ্রামবাসীও আদর-যত্নে আগলে রেখেছে পাখিদের। নিরাপদ আশ্রয়, মানুষের ভালবাসায় শামুকখোলদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পাখি ও মানুষের এই মিতালি এ গ্রামে প্রায় ৫ বছর ধরে চলে আসছে।

ঘন বাঁশঝাড়, আমগাছ, শিমুলগাছসহ অর্ধমাইল জঙ্গলে শামুখ খোল পাখির নিরাপদ আশ্রয়। শীতের মৌসুমে এই শামুখখোল পাখি চলে যায়। দেখা মিলে না তিন থেকে চার মাস। বর্তমানে নিরাপদ আশ্রয়ে প্রজননও করছে পাখিগুলো। ফলে, দিন দিন বাড়ছে পাখির সংখ্যা। গোটা গ্রামের মানুষ নিরাপত্তা দিয়ে আগলে রেখেছে পাখিদের। এই পাখির রাজ্যে সবাইকে স্বাগত। তবে কোনোভাবেই পাখিকে উপদ্রব করা চলবে না। শিকার নিষিদ্ধ।

চলবে না বন্দুক, ইয়ারগান ও ফাঁদ বহন করা। পাখি শিকারিদের ঠেকাতে এখানে গ্রামবাসী অত্যন্ত সতেচন। শামুকখোল পাখি এলাকার মানুষের কাছে শামুক ভাঙ্গা, হাইতোলা মুখ- এসব নামেও পরিচিত। খাল-বিলের ছোট ছোট শামুক-ঝিনুক, ছোট মাছ, আর ফসলের মাঠের পোকা-মাকড় খেয়ে জীবন বাঁচায় শামুক খোল পাখি।

সরেজমিনে গিয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বললে রেজওয়ান জানান, খুব ভোরে পাখিরা জেগে ওঠে। কিচিরমিচির করে। সকাল-বিকাল এক সুন্দর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পাখিগুলো ডানা মেলে ওড়ে। পোকামাকড়সহ খাদ্যের খোঁজে মাটিতে নামে। উড়ে যায় বিলে। সন্ধ্যার আগে আগে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি ফিরে আসে নীড়ে।

৫ বছর ধরে তারা পরম মমতায় পাখির দেখভাল করে আসছেন। এলাকার বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম বলেন, গ্রামের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তার দুই পাশ ঘেঁষে জলপাইগাছ, আকাশমনিগাছ, বাঁশঝাড়, শিমুলগাছ, আমগাছ, ও জঙ্গলে পাখি বাসা তৈরি করে। ৫ বছর ধরে এখানে পাখি বসবাস করছে।

একসময় অনেক প্রজাতির পাখি ছিল। এখানে শীতকালীন সময়ে অনেক প্রজাতির পাখির দেখা মেলে এখানে। পাখিরা এখন তাদের জীবনের একটি অংশ। স্থানীয় বাসিন্দা হেলাল বলেন, শামুখখোল পাখির বিষ্ঠা ছড়ায় লোকালয়ে। তবে কেউ তাতে বিরক্ত হয় না। পাখিদের দেখভাল করে। নিজেরা কেউ পাখিকে বিরক্ত করে না। গৃহবধূ মোমেনা বেগম বলেন, বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ে শামুখখোল পাখির বাস করে। ক্ষুধা পেলে অনেক সময় পাখি উঠানে আসছে। চাল, খুদ, ভাত খায়। অন্য রকম এক মায়া পড়েছে পাখির ওপর।

বিডিপ্রেস এজেন্সি/এনকে/টিআই

আরও পড়ুন...