শফিউল বারী বাবু : দলীয় রাজনীতিতে আমার সাহসের বাতিঘর

আজিজুল বারি হেলাল : ফিরবে না শফিউল বারী বাবু আর কোন দিন রাজপথে আমাদের মিছিলে, উচ্চকিত শ্লোগানে ওর কন্ঠ থেকে আর ধ্বনিত হবে না,-

‘শ্বৈরাচার- ফ্যাসিষ্ট নিপাত যাক,
গনতন্ত্র মুক্তি পাক।’
অসম্ভব স্পষ্টবাদী, তেজদীপ্ত সাহসী বাবু শুধুই আমাদের স্মৃতির রাজপ্রাসাদের নিভৃত কন্দরে জ্বল জ্বল করবে ওর নির্ভেজাল দেশপ্রেম, সংগঠনের প্রতি হৃদয় নিঙ্গরানো দরদ এবং অপশক্তি- দেশদ্রোহীর বিরুদ্ধে ওর তীব্র ঘৃণা।

ছোটখাট আকৃতির দেহ সৌষ্ঠবের কর্মী বৎসল বাবু’কে কখন-কোথায়-কিভাবে দেখেছি বা মিশেছি তার উদ্বোধনী বিন্দু থেকে স্মৃতিপটে বিন্দু বিন্দু ফোটায় রেখা টানলে সমান্তরাল সময়ের অতীত রাজনৈতিক দর্শন-চর্চা,সক্রিয় ঘনঘটা অংশগ্রহন, পলাতক জীবন, কারাগারের প্রকোষ্ঠে
কঠিন স্মৃতি মনের মধ্যে ঠিক মত ধরা দেয় না। শুধু লুকোচুরি খেলে। এটা বয়সের দৌরাত্বে নয়, অন্তিম ঘটনার আকস্মিকতায় হত বিহব্বল মনে সুচনা করতেই ব্যাথায় বুকে ভাঙনের শব্দ শুনি।

সকাল থেকে রাত প্রায় দুইটা পর্যন্ত এ্যানী-বকুল-সেলিম-জুয়েল-মামুনের সাথে বাবুকে উন্নত চিকিৎসা ও বিদেশে চিকিৎসা সংক্রান্ত পরিকল্পনা করতে সেল ফোনে আলোচনা করি। বাবুর সহধর্মীনি শামসুন্নাহার হল ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী বিথীকা’র ম্যাসেন্জারে একটি মেসেজ করে ঘুমানোর চেষ্টা করি। কিন্তু রাত্রিতে সময়ের মালগাড়ীটা বিপুল সম্ভার নিয়ে ক্লান্তবেগে বয়ে যাচ্ছে। স্মৃতিতে ওর গোলগাল সুন্দর মুখখানি বার জলে ভাসা পদ্মের মতো ভেসে উঠছে। কখনো কুসুমাস্তীর্ণ, কখনো কন্টকাকির্ণ দীর্ঘ রাজনৈতিক অঙ্গনে ওর সাথে ফেলে আসা দিনগুলো মনের মধ্যে উকি দিয়ে ঘুমের দেশ থেকে আমাকে বহিস্কার করে। মনে হলো, না ঘুমিয়ে নামাজ পড়ে ওর আরোগ্যের জন্য দোয়া করি।নামাজ শেষ হতেই ঢাকার মসজিদগুলো থেকে মুয়াজ্বিনের কন্ঠ থেকে খোলা জানালা দিয়ে বাতাসে ভেসে এলো ভোরবেলার আজান,-
‘আল্লাহ মহান’
ঘুম থেকে নামাজ উত্তম।’
কিন্তু কালের ধুলা ঝেরে বাবু’কে নিয়ে স্মৃতির কাতরতায় আমি তো ঘুমোতে পারিনি।
ভোর পাঁচটা’র মুহুর্ত আগে সবেমাত্র ফজরের সুন্নত নামাজ পড়তে হাতবেঁধে দাড়িয়ে,-
‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ’র’ উচ্চারন করতেই আমার সেলফোন বেজে উঠলো এবং যথারীতি থেমে গেল, এভাবে দ্বিতীয়বার বেজে য়থারীতি থেমে গেল। দুই পাশে সালাম ফিরে সটান উঠে দাড়িয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে দেখি, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক মিলন ভাই ফোন করেছেন। আমি দ্রুত মিলন ভাইকে ফিরতি ফোন করতেই, ওপাশ থেকে ঝরা পাতার মতো কাঁপা কন্ঠে ভেসে এলো,-
‘আমাদের বাবু আর নেই।
আমরা দু’জনেই সশব্দে উচ্চারন করি,-
‘নিশ্চয় আমরা আল্লাহ’র জন্য , এবং আল্লাহ’র কাছেই ফিরে যাব।’
ঘোর লাগা মনে সম্বিত ফিরে পেতেই মনের জানলা- দরজা ভেঙে হুহু বাতাসের ঝাপটা’য় স্মৃতিতে খেলা করে ওঠে,-
ঢাকা কলেজ থেকে স্বৈরাচার বিরোধী এক ঝাঁক উচ্ছাসী রাজনৈতিক সচেতন তরুনের পদভারে রাজপথ কাঁপিয়ে, অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ, কলাভবনের দালান-বারান্দা, ডাকসু ভবন প্রকম্পিত করে মধুর ক্যান্টিনে মিছিল আসছে,
‘ অরুণ প্রাতের তরুন দল,
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।।’
ওই ছুঠেছে সেনাদল,
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।।’
গাঢ় নীল বর্ণের হারা ব্রান্ডের জিন্স পরিহিত, লাল ফুল স্লিভস গেন্জী গায়ে, নাইকি’র কেডস পায়ে। মাথা ভর্তি টানা টানা ল্ম্বা চুলে কপাল ছেয়ে যাওয়া,শফিউল বারী বাবুকে ওইদিন প্রথম চিনলাম। তারপর থেকে উভয়ে কখনো সরলে, কখনো গড়লে ভরা সম্পর্ক গড়েছি কিন্তু আন্তরিকতা কখনো থেমে থাকেনি। দীর্ঘ সময় ধরে বহমান সম্পর্কের স্রোতধারা এখন শুধুই অতিত কালের ইতিহাস।
বাবু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে বি.কম অনার্স প্রথমবর্ষে ভর্তি হয় এবং কৃতিত্বের সাথে বি.কম অনার্স এম.কম পাশ করে।পন্য বিপনন বিদ্যা যতটা না তাকে প্রলুদ্ধ করে তার থেকে দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা স্বৈরাচার উচ্ছেদের আন্দোলন তাকে বেশী আকর্ষন করে।
ওরা দলবেধে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে বেড়াত। চাপা স্বভাবের কারনে সহজেই নিজের মধ্যে একটি ব্যাক্তিত্ব্রের ছাপ তরুন বয়সেই রপ্ত করে। দলে কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে ওর ভিতর একটা দুর্বার আকর্ষন কাজ করত। শেখ মুজিবর রহমান হলের ছাত্র হলেও বাবু কলা ভবনের অন্তর্গত মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, হাজী মুহসীন হল, সূর্যসেন হল, জসীম উদ্দিন হলে বাবুর প্রানোচ্ছল ও সাংগঠনিক উপস্হিতি ছিল। ধীরে ধীরে নিজেকে সাহসী ও শক্তিশালী ছাত্রনেতা হিসাবে পরিচিতি করে তোলে। স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে বাবু তখন, হার না মানা মনোবল আর সাহসের কঠিন পরীক্ষার আগুনে পুড়ে কারাগারের লৌহ প্রাচীর, হুলিয়া- মামলা- হামলা সমস্ত ভয় কে জয় করে সমবয়সী অনেকের থেকে এগিয়ে সাহসী’দের কাতারে নিজের অবস্হান সুদৃঢ় করে।
পদ প্রত্যাশী ছাত্রকর্মীর সংস্কৃতিতে না ঝুঁকে, মস্তিস্কে দেশপ্রেম এবং বুক ভরা সাহস নিয়ে রাষ্ট্র দখল কারী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতি বাবু’র প্রবল আকর্ষন ছিল। ওর প্রিয় শ্লোগান ছিল,-
‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই,
লড়াই করে বাঁচতে চায়।
৯০’র দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের আগুন ঝরা দিনগুলোতে উত্তপ্ত রাজপথে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের অগ্রগামী সৈনিক হিসাবে প্রানবন্ত উপস্হিতি, বাবু’র পরবর্তী রাজনীতির পথকে গতিময় করেছিল। শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক নির্বাচিত হয়ে প্রথম ছাত্রনেতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে বাবু মেধা ও ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের যে আলো জ্বেলে ছিল, সেই আলোতেই পরবর্তী রাজনীতির দীর্ঘ মহাসড়কে পদ-পদবী’র পর্যায়ক্রমিক মাইল ফলক পাড়িঁ দিতে বাবু’কে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করেছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহবায়ক পদে নির্বাচিত হয়ে বাবু বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ইউনিট গুলো একটা শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তির উপর দাঁড় করায়।এক্ষেত্রে বাবুর থিওরি ছিল সংগঠনের মধ্যে বহুল প্রচলিত ‘মাই ম্যান’ তৈরী করে পদ বন্টন নয় বরং সংগঠনের জন্য নিবেদিত প্রান নির্ভীক কর্মী তৈরী করে পদ বিন্যাস করা।
পরবর্তীতে বৎসর কেন্দ্রীয় সম্মেলনে বাবু কেন্দ্রীয় সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়। ছাত্রদলের এক সময়কার দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসাবে পরিচিত বৃহত্তর চট্রগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন থানা কলেজ ইউনিট গুলিতে স্হানীয় রাজনীতির অন্তর্দ্বন্ধে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে ইউনিট গুলি উপযুক্ত তত্ত্বাবধানের অভাবে ধীরে ধীরে সাংগঠনিক ভাবে স্হবির হয়ে পড়ে এবং চরম আকারে নেতৃত্বের জট লেগে যায়। বৃহত্তর চট্রগ্রামের সাংগঠনিক ইউনিট গুলির পূনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়ে মাসের পর মাস বাবু চট্রগ্রামে অবস্হান করে। তার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্হানীয় ও চট্রগ্রামে অবস্হিত জাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে শলা- পরামর্শ করে স্হবির হয়ে পড়া ইউনিট ও মেয়াদ উত্তির্ণ বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করে। এখানেও বাবু সংগঠনের মধ্যে নিজের কর্মী নয়, দলের মধ্যে দক্ষ কর্মী সৃষ্টির নীতি নিয়ে বৃহত্তর চট্রগ্রামের বিভিন্ন ইউনিটের ছাত্রদলকে গতিশীল করে।
ছাত্র আন্দোলনে, চট্রগ্রাম সরকারী কলেজ, চট্রগ্রাম কমার্স কলেজ, চট্রগ্রাম আইন কলেজ ইত্যাদি ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু স্হানীয় রাজনীতির জঠিল সমীকরণে ছাত্রদলের নেতৃত্ব সেখানে বছরব্যাপী নিস্কৃয় অবস্হায় থাকে।
বুদ্ধিমান ছাত্রনেতা বাবু তখন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি শাহাবুদ্দিন লালটু ও কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক হিসাবে আমাকে চট্রগ্রামে আমন্ত্রণ জানিয়ে উক্ত কলেজ সমুহে সংক্ষিপ্ত আকারে ছাত্রসভার ব্যাবস্থা করে এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে তৎক্ষুনাৎ নতুন আহবায়ক কমিটি গঠন করে ও নতুন সম্মেলনের তারিখ ঘোষনা করে। ফলে সেখানকার ঝিমিয়ে পড়া ইউনিট গুলো নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্হিতিতে সংগঠনের কার্যক্রমে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে।
চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলিতে বাবু কিছুদিন অবস্হান করে প্রত্যক্ষ করে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের প্রশ্রয়ে একটি রক্ষনশীল ছাত্রসংগঠন বিভিন্ন ভাবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের চাপে রেখে সংগঠনের কর্মকান্ড ও কর্মসূচী পালনে পদে পদে বাঁধার সৃষ্টি করে। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতা কর্মীরা উৎপীড়িত ও নিপীড়িত অবস্হায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালায়।
আমাকে এই তথ্য জানিয়ে বাবু পরামর্শ দেয়,-
‘নতুন কর্মী সংগ্রহে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীন বরণ অনুষ্ঠান ও ঢাকা থেকে নামী ব্যান্ড সংগীত দল এনে গানের কনসার্ট আয়োজন করতে হবে। এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে দেখা করে সমস্যা সমাধান প্রয়োজন।’ বাবু নবীন বরণ ও কনসার্ট অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করে এবং আমি, তারকা খ্যাত ব্যান্ড সংগীত শিল্পী জেমস’কে নিমন্ত্রণ করে নির্ধারিত তারিখে সেখানে যায়। চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর সেদিন হাজার হাজার ছাত্র- ছাত্রীদের কলকবে মুখরিত হয়।নবীন ও পুরাতন ছাত্রছাত্রীরা ছাত্রদলের ভূমিকার প্রশংসা করে তাদের বক্তব্যে বলে, দীর্ঘদিন পর দমবন্ধ অবস্হা থেকে তারা যেন মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে বাবু’র পরামর্শ মতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ সহ আমি ও বাবু উপাচার্য মহোদয়ের সাথে সাক্ষ্যাৎ করি। আলোচনায় বাবু পরিশীলিত ভাষায় কিন্তু দৃঢ় কন্ঠে গনতান্ত্রিক সকল ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনায় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে সমস্ত বাঁধা দুর করার দাবী জানায়। বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকা কালে, বৃহত্তর চট্রগ্রামের বিভিন্ন ইউনিট গুলি যেন বানিজ্যিক লোভে দুর্বৃত্তায়নের কবলে না পড়ে এবং সাধারন ছাত্রছাত্রীদের অধিকার আদায়ের প্লাটফর্মে পরিনত হয়। এজন্য ছাত্রনেতা শফিউল বারী বাবু চট্রগ্রামের প্রতিটি ইউনিট সফর করে সহযোদ্ধা নেতা কর্মীদের উদ্দেশ্যে শত শত বক্তৃতায় অনুপ্রেরনা যোগায়।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠার হীরক জয়ন্তি বৎসরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ছাত্রনেতা শফিউল বারী বাবু সাংগঠনিক দক্ষতা, যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার বিচারে সংগঠনের সাধারন সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্রিয়াশীল এই পদে বাবু অসাধারন মেধার স্বাক্ষর রেখে দলীয় কর্মসূচী পালন ও কর্মকান্ড পরিচালনা করে।
জননেতা তারেক রহমান নেতাকর্মীদের পরস্পর সম্প্রীতি’র বন্ধন সৃষ্টি ও ছাত্র নেতৃত্ব থেকে জাতীয় নেতা তৈরীর বাসনা’য় যে সমস্ত ইনোভেটিভ আইডিয়া ছাত্রদল কে উপহার দেন। তার মধ্যে অনুপ্রেরনা দান কারী অন্যতম আইডিয়া ছিল দেশব্যাপী ছাত্রদলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উপস্হিতিতে বিভাগীয় প্রতিনিধি সভার আয়োজন করা। বৃহৎ এই কর্মযজ্ঞ সফল ভাবে আয়োজনে এবং জননেতা তারেক রহমানের ইনোভেটিভ আইডিয়া’র যথাযথ বাস্তবায়নে বাবুর চিন্তাশীল ও পরিশ্রমী ভূমিকা সবার নজর কাড়ে। তাই হয়ত বাবুর সাংগঠনিক দক্ষতা’য় মুগ্ধ হয়ে জননেতা তারেক রহমান বরিশাল বিভাগীয় প্রতিনিধি সভায় বলেন,-
‘বিএনপি নামক বৃহৎ বটবৃক্ষের মাটির গভীরে প্রথিত শক্ত শেকড় হলো জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে হাজার হাজার নেতাকর্মী।’
ক্ষমতাসীন ছাত্রদলের সাধারন সম্পাদক হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল সকল ছাত্রসংগঠনের সংগে সৌভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক বজায় রেখে ক্যাম্পাসের চিরকালীন এ্যান্টি এশটাব্লিশমেন্ট চরিত্রকে প্রশমনে বাবু’র ছিল অনন্য সাধারন ভূমিকা।
এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠন গুলোর সাথে সাংঘর্ষিক যে কোন পরিস্হিতিতে সকল ছাত্র সংগঠন একত্রে সর্বদলীয় বৈঠক কিংবা বিবাদমান সংগঠনের সাথে ডায়ালগের আয়োজনে বাবু’র প্রশংসনীয় উদ্যোগ ছিল। ক্যাম্পাস থেকে বিরোধী দলের কোন ছাত্রনেতা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকারে গ্রেফতার হবে। এই অপসংস্কৃতি’র তীব্র বিরোধী ছিল শফিউল বারী বাবু। ক্যাম্পাসে শিক্ষা উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখতে এবং ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠন গুলো বাঁধাহীন ভাবে যেন, গনতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা করতে পারে, অন্যায় ভাবে ক্যাম্পাস থেকে কোন ছাত্রনেতা যেন গ্রেফতার না হয় এই দাবী স্পষ্টভাষায় বাবু সেই সময়কার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে সামনা সামনি অবহিত করে। সম্প্রীতি’র ছাত্র রাজনীতি বিনির্মানে বাবুর অনবদ্য ভূমিকা’র কারনে ২০০১ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বিএনপি আমলে বিচ্ছিন্ন দু-একটি বিক্ষিপ্ত হাতাহাতির মতো ঘটনা ব্যাতীত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংঘর্ষের কারনে একদিনের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়নি। প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠন সরকার বিরোধী মিছিল মিটিং করলেও ক্যাম্পাস থেকে বিরোধী সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ কখনোই গ্রেফতার হয়নি। এমনকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জবর দখল কারী আ:লীগ সরকারের মত ছাত্রনেতৃবৃন্দের উপর শত শত মিথ্যা মামলা চাপিয়ে দিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতর বাহির কোথা থেকেও ছাত্রনেতারা গনহারে গ্রেফতার হয়নি। অথচ এই শফিউল বারী বাবু স্বৈরাচার থেকে বর্তমান ফ্যাসিষ্ট সরকারের আমল পর্যন্ত ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অসংখ্যবার অন্যায় ভাবে গ্রেফতার হয়েছে। পৃথিবী ছেড়ে চিরতরে বিদায়ের প্রাক্কালেও ফ্যাসিষ্ট সরকার শতাধিক মিথ্যা মামলায় তাকে অভিযুক্ত করে রেখেছে। বাবু’র সাথে দীর্ঘ বত্রিশ বছরের সম্পর্কে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিষ্টের জারী করা হুলিয়া নিয়ে অসংখ্য বার পলাতক জীবনে বাবু’র সাথে আমার গল্প-কথা-স্মৃতি সব কিছুই স্ফঠিকের মতো স্বচ্ছ ও পরিস্কার শুধু ব্যাক্তি বাবু এখন আর নেই নেই। মৃত্যুর ধুম্র আলিঙ্গনে, ও এখন গল্প-কথা’র মতোই স্মৃতিময়।
ৎসর্বশেষ যখন বর্তমান ফ্যাসিষ্ট সরকার ওর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গ্রেফতার করে ওঁকে কেরানীগন্জ কারাগারের সূর্যমুখি সেলের চার তলায় দশ নম্বর রূমে অন্তরীন করে। যেখানে আমি আগে থেকেই আটক ছিলাম। এরপর প্রায় পাঁচ মাস আমি ও বাবু কারাগারে একই প্রকোষ্টে বন্দি থাকি। কারাগার- প্রকোষ্ঠ, রং-ঢং’য়ের স্মৃতি সবকিছুই আমার ম্রিয়মান চোখে অম্লান, শুধু বিপন্ন বিপদে ভেঙে না পরা অদম্য সাহসী বাবু অনুপস্হিত।
বই কেনা ও বই পড়া’য় ওর একটু আধটু নেশা ছিল।
রাজনৈতিক ইতিহাস পাঠের প্রতি ওর ঝোঁক ছিল। ডন ব্রাউন রচিত আ্যামেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের ইতিহাস সম্বলিত ‘আমারে কবর দিও হাঁঠু ভাঙার বাঁকে’ বইটি পড়তে বাবু আমাকে উপহার দেয়।
চানক্য সেন রচিত জামাল আব্দুল নাসের’এর নেতৃত্বে মিশর বিপ্লবের উপর লিখিত ‘ ধীরে বহে নীল’ বইটি আমার কাছ থেকে ধার নিয়ে বাবু একাধিক বার পড়ে।
(অসমাপ্ত)
দলীয় রাজনীতিতে আমার সাহসের বাতিঘর জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাবেক ছাত্রনেতা শফিউল বারী বাবু’কে নিয়ে আমার এই লেখা কখন শেষ হবে জানিনা।

লেখক: সাবেক সভাপতি,জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
বিডিপ্রেস এজেন্সি/টিআই

আরও পড়ুন...