যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্য শিক্ষা কিশোর-তরুণদের অধিকার

লেখকের ছবি।

জিয়াউদ্দিন লিটন : মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো কৈশোর (Adolescence)। শৈশব ও বাল্য পেরিয়ে সংক্ষিপ্ত বয়সন্ধির মধ্যে দিয়ে যৌবনের দ্বার প্রান্তে পৌছানোর যে দ্রুত, বাড়ন্ত, পরিবর্তনশীল সময় তাকে কৈশোরকাল (Adolescence) বলা হয়। এই সময়ে ছেলেমেয়েদের মধ্যে এত দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তন হয় যে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। আসলে কৈশোর কি এ নিয়ে নানা রকম মত দেখা যায়।

শৈশবকালের প্রথম দু’বছর শিশুদের বর্ধন দ্রুত হয়, তারপর ভিড় মন্থর হয়ে আসে। কৈশোরের সূচনায় বয়ঃসন্ধি কালে আবার এই বর্ধন নাটকীয় ভাবে আকস্মিক দ্রুততা লাভ করে এবং পরে আবার মন্থর হয়ে যায়। এই দ্রুতবর্ধনশীল সাধারণত ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের তাড়াতাড়ি হয়। দশ বছর বয়সে ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে লম্বা ও ভারী হয়, কিন্তু তের বছরে ক্রমে দেখা যায় মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে লম্বা ও ভারী হয়ে যায়।

ষোল বছর বয়সে ছেলেমেয়েদের অবস্থান আবার কৈশোর পূর্ব স্তরের অবস্থানে ফিরে যায়। আবার ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে বেশি লম্বা ও ওজনে ভারী হয়ে যায়। ছেলে ও মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই দ্রুত বর্ধনশীল সময় প্রারম্ভিক কৈশোরেই উপস্থিত। মেয়েদেরে বর্ধন ষোল বছরে শেষ হয়। সব চেয়ে বেশি বর্ধন ঘটে ১৩/১৪ বছরে। ছেলেদের বর্ধন ১২/১৩ বছরে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৮/১৯ বছর বয়সে। সবচেয়ে বেশি বর্ধন ঘটে ১৫/১৬ বয়সে। আর এই বয়সটাতেই আমাদের কিশোর-কিশোরীরা তাদের শারীরিক-মানসিক পরিবর্তনের কারণ ও তার প্রতিকার সম্পর্কে জানা থেকে দূরে থাকে।

যেকোনো উন্নয়নকাজেই চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে।আমি একটি জায়গায় দৃষ্টি আকর্ষণ করব।বাংলাদেশের মেয়েদের কি আসলে কৈশোর বলে কিছু আছে? একটি কিশোরকে যতটুকু গুরুত্ব দেওয়া হয়, একজন কিশোরীকে ততটুকু গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাই আজকের বিষয় যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্য শিক্ষা কৈশোর ও তারুণ্যের অধিকার।

আমি অধিকার বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিতে চাই। আমরা কিশোর-তরুণদের অধিকারের কথা বলছি। কিন্তু প্রায়ই আমরা তাদের বলি, বড় হও, শিখে ফেলবে। এই বেড়ে ওঠার মধ্যেই সে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। আমাদের দেশে দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য, বাল্যবিবাহ, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, নিরক্ষরতাসহ এমন কয়েকটি প্রধান কারণ যুবক ও কিশোর-কিশোরীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য অধিকারকে প্রভাবিত করে। এখানকার মেয়েরা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছার আগেই তাদের বিয়ে হয়।

তাদের সন্তান হচ্ছে। কৈশোরবয়সি মেয়েদের যৌন ও প্রজনন অধিকার লঙ্ঘনের উল্লেখযোগ্য নিষ্ঠুরতম রূপ হলো বাল্যবিবাহ। এর মাধ্যমেই তাদের পড়াশোনা চালানোর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর বাল্যবিবাহের কারণে অনেক তরুণ সম্ভাবনা মেরে ফেলা হচ্ছে। ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সের জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। বর্তমানে বাংলাদেশের মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স ১৮ বছর। ২০ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে প্রতি ১ হাজার নবজাতকের জন্মদানে ৩১ জনের মৃত্যু হয়। কিশোরীরা নিজ পরিজন দ্বারা এমনকি বিবাহিত নারীরা স্বামীর দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হন। যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্যঅধিকারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও আর্থসামাজিক কিছু ঝুঁকি রয়েছে।

যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্য শিক্ষা পাওয়া তরুণ-তরুণী সবার অধিকার। এটা মানবাধিকার, যেটা প্রত্যেকেরই পাওয়া উচিত। আমাদের তরুণদের জীবনকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করাটা খুব জরুরি। কারণ, তাদের ওপর অনেক গুরুদায়িত্ব। আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশকে ‘এশিয়ার টাইগার’ বলা হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তরুণদের কাজে লাগাতে হবে। সে জন্য তাঁদের গুণগত মানসম্পন্ন ও জীবনমুখী শিক্ষা দেওয়া খুব জরুরি।

আমাদের প্রজন্ম ছিল বইকেন্দ্রিক। যথেষ্ট ব্যবহারিক জ্ঞান না থাকায় আমাদের অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বাংলাদেশের শিক্ষার এই ধরন পরিবর্তন হওয়া খুব জরুরি। জীবন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা হওয়া জরুরি। একজন মানুষ নিজে সুস্থ না থাকলে তিনি তাঁর পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য কীভাবে কাজ করবেন।

সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। সে ক্ষেত্রে যৌন ও প্রজনন অধিকার সম্পর্কে সহযোগিতা না পেলে তাঁরা কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবেন না। মানসিক স্বাস্থ্যকেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আমাদের আইন রয়েছে। এসব আইনের প্রয়োগে আমরা কিছু প্রতিবন্ধকতা পাচ্ছি। এসব আইন ও নীতিমালা যেন ভালোভাবে প্রয়োগ করা হয়।

আমি যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্য শিক্ষার চ্যালেঞ্জগুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে চাই। যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্য—দুটো বিষয়ই খুব সংবেদনশীল। অথচ স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রে এটা সেভাবে আলোচনা হচ্ছে না। স্কুলের শিক্ষকেরা বিষয়গুলো জানেন কিন্তু তাঁদের পারদর্শিতার ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধা রয়েছে। কারণ, আমাদের প্রশিক্ষণগুলো সেভাবে সাজানো হচ্ছে না। কিছু কিশোর কেন্দ্র করা হয়েছে। কিন্তু এসব কেন্দ্রে কিশোর-কিশোরীরা যাচ্ছে না কেননা, কেন্দ্রগুলো তাদের উপযোগী করে করা হয়নি।

কিশোর-কিশোরীদের অনেক রকমের আবেগময়, সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সেবার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা দেখেছি কিশোর-কিশোরীরা তাদের জীবনের কথা বলার সময় উত্ত্যক্তকরণ, যৌন হয়রানি ও সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান নিয়ে কথা বলে। ছেলে ও মেয়ে উভয়ের মধ্যে এ বিষয়টি লক্ষ করা যায়। কিশোর হওয়ার সামাজিক ও মানসিক দিক বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে। যৌন সক্রিয়তা ও ধূমপানকে অনেক ছেলেই সামর্থ্যবান পুরুষের প্রতীক মনে করে। অনেক মেয়ে চুপচাপ থাকাকে ভালো মেয়ের লক্ষণ মনে করে।

রবিঠাকুরের বিখ্যাত ছোটগল্প “ছুটি”-র ফটিকের কথা মনে পড়ে, সেখানে বয়ঃসন্ধিকালীন বয়সের প্রতিভূ চরিত্র হিসেবে ফটিক সম্পর্কে যা বলা হয়েছিলো তা যেন আমাদের কিশোর-কিশোরীদেরই মনের কোটরবন্দী কথা, “তেরো-চৌদ্দ বছরের” ছেলেমেয়েরা “সর্বদা মনে-মনে বুঝিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না ইত্যাদি ইত্যাদি অথচ, এই বয়সেই স্নেহের জন্য কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত কাতরতা মনে জন্মায়”।

এই ফটিকের মতই প্রায় পাঁচ কোটি কিশোর-কিশোরীর বসবাস এই ছোট্ট দেশে যাদের বয়স ১০ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। এই সংখ্যাটা নেহায়েত কম তো নয়ই বরং এই সংখ্যা আমাদের সমগ্র জনসংখ্যার ২১ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই দেশের সামগ্রিক মাপকাঠিতে এই জনগোষ্ঠীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বয়ঃসন্ধি হচ্ছে ১০-১৯ বছরের বয়স সীমার মাঝে জীবনের এমন একটি ধাপ, যার মাধ্যমে একটি শিশুর প্রজনন ক্ষমতার পাশাপাশি শরীর ও মনে কিছু পরিবর্তন আসে এবং সে ধীরে ধীরে একটা পূর্ণবয়স্ক মানুষে পরিণত হয়। বিভিন্ন এলাকার বেশকিছু বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোর-কিশোরী এবং তাদের পরিবার ও পারিপার্শ্বিক সমাজকে নিয়ে চালানো আলোচনায় উঠে আসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও চমকপ্রদ তথ্য।

তাদের সাথে কথা বলে দেখা গেছে, স্কুল পাঠ্যক্রমে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে ঠিকভাবে শেখানো হয় না। এই কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধির ব্যাপারে যথেষ্ট ধারণাও নেই। শতকরা ১৭ ভাগ কিশোর ও ২৭ ভাগ কিশোরী ঠিকমত কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির নাম বলতে পেরেছে। ১৫ বছর বয়সী কিশোর রফিক (ছদ্মনাম) আমাদের জানায়, “ক্লাস সিক্সে উঠে শারীরিক শিক্ষা বই থেকে আমরা জানতে পারি বয়ঃসন্ধি সম্পর্কে।

“আদতে তাদের স্কুলের বইতে শুধু একটি অধ্যায়েই কৈশোরকালীন শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা রয়েছে, তাও কেবল মাসিক ও বয়ঃসন্ধি নিয়ে আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ। আবার, শিক্ষকেরা যখন ক্লাসে মাসিক নিয়ে পড়ানো শুরু করে, তখন ছেলেদের ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হয়; যার ফলে তারা এ সম্পর্কিত জ্ঞান থেকে দূরেই থেকে যায়! এমনকি একজন কিশোরের সাথে কথা বলে জানা যায়, ছেলেদের ক্ষেত্রে শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে বাবা কিংবা মায়ের সাথে আলোচনা করার বিষয়টিও ঘটে না লজ্জা ও সংকোচের কারণে।

ছেলেদের ক্ষেত্রে তাদের মনোদৈহিক পরিবর্তন ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বা জানার বিষয়টা সীমাবদ্ধ মূলত বন্ধুদের সাথে আলাপ কিংবা স্কুলের শারীরিক শিক্ষা বইয়ের সেই একটি অধ্যায়ে সীমিত জ্ঞান। মায়েরাও তাদের কন্যাসন্তানের সাথে খোলাখুলি আলাপ করতে স্বচ্ছন্দবোধ করলেও ছেলেসন্তানদের সাথে আলোচনা করতে মোটেই স্বচ্ছন্দ নন।

একই কথা প্রযোজ্য কিশোরীদের ক্ষেত্রেও। তাদের অনেকেই বড়জোর মায়েদের সাথে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক আলাপ করে থাকে। শিরিন (ছদ্মনাম) নামের এক কিশোরী জানায়, কেবল বাবা-মা নয়, স্কুলের শিক্ষকরাও তাদেরকে প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষাদানের ব্যাপারে সংকোচবোধ করেন। তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শিক্ষক খোলামেলা না বললে অনেক শিক্ষার্থী বোঝে না আবার অনেকেই বুঝেও না বোঝার ভান করে বা আপত্তিকর প্রশ্ন করে শিক্ষককে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে।আবার বিষয়টি খোলামেলা আলোচনা করলে অনেক শিক্ষার্থী বা অভিভাবক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তাকে অপদস্থ করে থাকেন।

যাহোক, যৌন ও প্রজনন–স্বাস্থ্য অধিকার এমন যে, সে যখন বেড়ে ওঠে, তখন তার মনে অনেক প্রশ্ন আসে। সে বুঝতে পারে না যে কোথায় গেলে এসবের উত্তর পাবে। বইয়ে যেটুকু তথ্য আছে, তা পড়ানো হচ্ছে না। মা–বাবার কাছ থেকে জানতে চাইলে বলেন, চুপ করো, সময় হলে জানতে পারবে। তাদের এসব বিষয় জানতে দিতে হবে।

ইউনিসেফ ২০১৭ সালে একটা গবেষণা (স্টাডি) করেছিলো। গবেষণায় এসেছে ১৮ বছরের আগে ৫৫ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। এর মধ্যে ২২ শতাংশের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে। তাদের সংসারজীবনে ঠেলে দিচ্ছি। অথচ কোনো তথ্য জানতে দিচ্ছি না। এটা একধরনের পরিহাস। তাদের তথ্য জানার অধিকার আছে। ঠিক তেমনি সমস্যা জানার পর সেবা পাওয়ার অধিকারও রয়েছে। কিশোর-তরুণদের এসব তথ্য জানার সুবিধা দিতে হবে।

লেখক : শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

বিডিপ্রেস এজেন্সি/সানিয়াত

আরও পড়ুন...