মানবিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে পুলিশের নতুন গর্ব ‘দোলন’

মেহেদি হাসান দোলন। ছবি: বিডিপ্রেস এজেন্সি।  

তাসবির ইকবাল : সময়ে সময়ে আলোচনা-সমালোচনায় পুলিশের খারাপ দিকগুলোই বেশি মুখরোচক হয়ে ওঠে। পুলিশ যে জনগণের বন্ধু, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করার পাশাপাশি তারা যে মানবিক কাজের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই তা আমরা ভুলে যাই। দু-একজনের অপকর্মে পুরো পুলিশ বাহিনীকে সমালোচনায় বিদ্ধ করি আমরাই। তবে পুলিশের মাঝেও এরকম পুলিশ রয়েছেন যে কিনা প্রতিনিয়ত অসহায় মানুষের জন্য বিলিয়ে দিচ্ছেন নিজেকে, তাদের জন্য করে যাচ্ছেন অক্লান্ত পরিশ্রম এছাড়াও সামাজিক ও নৈতিক কর্ম-কান্ডের মধ্যেও রয়েছে তার অবাদ বিচরণ। এমনই একজন মানবিক পুলিশ কনস্টেবল মেহেদি হাসান দোলন। সামাজিক ও নৈতিক কর্মকান্ডে তার প্রশংসা ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন প্রান্তে। বর্তমানে তিনি কর্মরত আছেন বান্দরবান জেলা পুলিশে।

শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করছেন মেহেদি হাসান দোলন। ছবি: বিডিপ্রেস এজেন্সি। 

ছোট বেলা থেকেই মেহেদি হাসান দোলন অসহায় মানুষের জন্য ভালো কিছু করার এবং সামাজিক কাজ-কর্মের সঙ্গে নিজেকে লিপ্ত করার স্বপ্ন দেখতেন। সে সময় পারিবারিক নানান কারণে তিনি সেগুলো করতে পারেননি। অতপর ২০১৬ সালে যখন বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করলেন তারপর থেকেই তিনি প্রতিনিয়ত মানবিক-সামাজিক সকল কাজ করে যাচ্ছেন বিনাস্বার্থে। এছাড়া ২০১৮ সালে দেশের কিছু জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং টিভি-চ্যানেলে প্রথম মেহেদি হাসান দোলনের মানবিক কার্যাবলীর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, আমি মানুষের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারিনা, ছোটবেলা থেকে আমার মানুষের জন্য ভালো কাজ করার প্রবল ইচ্ছে ছিল কিন্তু নানান কারণে আমি এসব কাজগুলো করতে পারিনি। কিন্তু এখন জীবনের বাকি সময়গুলো আমি অসহায়-অবহেলিত মানুষের তরে খরচ করতে চাই।

রাস্তার অসহায় মহিলাকে খাবার খাওয়াচ্ছেন মেহেদি হাসান দোলন। ছবি: বিডিপ্রেস এজেন্সি। 

মেহেদি হাসান দোলনের প্রতিটি কাজই যেন মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়। কখনও তাকে দেখা রাস্তার অসহায় ভিখারীদের খাওয়াচ্ছেন, কখনও দেখা যায় তিনি অভাবগ্রস্থ কৃষকদের মাঝে বীজ, কীটনাশক, সার ইত্যাদি নিয়ে হাজির হয়েছেন, আবার কখনও দেখা যায় পাঠশালার শিক্ষার্থীদের পড়াতে। এসকল কাজ তিনি তার উপার্জিত অর্থের কিছু অংশ দিয়ে করে থাকেন।

এক ব্যাক্তিকে ‘মানবিক স্টোর’ নামে ভ্রাম্যমাণ দোকান উপহার দিয়েছেন মেহেদি হাসান দোলন। ছবি: বিডিপ্রেস এজেন্সি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেদি হাসান দোলন বলেন, আমি প্রতি মাসে যে টাকা রোজগার করি তার থেকে কিছু টাকা আমার পরিবারকে পাঠাই এবং বাকি টাকাগুলোর কিছু অংশ আমি মানবিক-সামাজিক কাজের জন্য ব্যয় করে থাকি আর সামান্য অংশ আমার ব্যাক্তিগত কাজে লাগাই।

কৃষিনির ফসলের খোঁজ-খবর নিতে ছুটে এসেছেন মেহেদি হাসান দোলন। ছবি: বিডিপ্রেস এজেন্সি। 

চলমান করোনা পরিস্থিতিতে সকল শ্রেণীর পেশার মানুষ অভাব-অনটনের সম্মুখীন হয়েছেন। অনেকেই বসেছেন পথে-ঘাটে দুমুঠো আহারের জন্যে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও কনস্টেবল মেহেদি হাসান দোলন দমে যাননি, চালিয়ে গিয়েছেন নিজের করে আসা মানবিক-সামাজিক কর্ম-কান্ডগুলো। পথ-ঘাট ছাড়াও বাড়ি বাড়ি গিয়ে অসহায়-অভাবগ্রস্থ মানুষকে করে দিয়েছেন খাবারের সুযোগ এছাড়াও নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে হাজির হয়েছেন বহু মানুষের দরজায়।

প্রান্তিক জনপদে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদে ‘মানবিক পাঠশালা’ নামের একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন মেহেদি হাসান দোলন। ছবি: বিডিপ্রেস এজেন্সি। 

এছাড়া মুজিববর্ষ উপলক্ষে ২৪ হাজার বৃক্ষ রোপণ করে সাড়া জাগিয়েছেন তিনি। পরিবেশ বদলে দিয়ে যেন পরিবেশ বন্ধু তিনি। রাস্তার পাশে গাছ লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে দোলন ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যেসব মানুষ বৃক্ষপ্রেমী, গাছ লাগাতে ইচ্ছুক তাদের মাঝে গাছের চারা বিতরণ করেছেন তিনি।গাছ লাগানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইউটিউবে পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন ভিডিওতে দেখেছি, আমাদের পরিবেশ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে।

পাহাড়ি এলাকার কিছু মানুষকে নিয়ে একান্ত আড্ডায় মেহেদি হাসান দোলন। ছবি: বিডিপ্রেস এজেন্সি।

তাপমাত্রা বাড়ায় সমুদ্রে থাকা বড় বড় বরফ খণ্ড গলে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এমনটা চলতে থাকলে পৃথিবী হুমকির মুখে পড়বে। সেই জায়গা থেকে দেখি যে কেবল গাছই আমাদের এ কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে পারে। সে জন্য গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছি। এ উদ্যোগের নাম দিয়েছি মানবিক পরিবেশ।

রিকশাওয়ালার হাতে ত্রাণ সামগ্রী তুলে দিচ্ছেন মেহেদি হাসান দোলন। ছবি: বিডিপ্রেস এজেন্সি। 

এছাড়া কর্মস্থলে মানবিক কাজের অনন্য এক নজির গড়েছেন তিনি। নিজের বেতনের কিছু অংশ দিয়ে সাত জন অসহায় মানুষকে দোকান করে দেওয়ার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করেছেন। এদের মধ্যে পাঁচ জনকে স্থায়ী ও দুই জনকে ভ্রাম্যমাণ দোকানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তারা এখন নিজেরাই নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছে।

কৃষকদের বীজ ও কঅটনাশক দিচ্ছেন মেহেদি হাসান দোলন। ছবি: বিডিপ্রেস এজেন্সি।

সামাজিক কাজের অনুভূতি কেমন জানতে চাইলে পুলিশ কনস্টেবল মেহেদি হাসান দোলন বলেন, ‘পুলিশের একজন সদস্য হিসেবে এসব মানবিক কাজ করতে পারায় আমি অনেক আনন্দিত। সাধারণ মানুষ যেভাবে পুলিশের ভয়ে আতঙ্কে থাকে, আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা একদমই ব্যতিক্রম। আমাকে দেখলে মানুষ মনে করে যে তাদের বন্ধু এসেছে, পুলিশ ভাই এসেছে। তাদের জন্য কিছু করতে এসেছে। এই যে ভালো লাগা, এখান থেকেই কাজের শক্তি পাই এবং আজীবন মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই যতদিন আল্লাহ হায়াত রেখেছেন।

বিডিপ্রেস এজেন্সি/অনিকেত আহসান

 

আরও পড়ুন...