ভারত ‘জাতিসঙ্ঘকে’ বুঝতেই পারেনি!

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। 

বিডিপ্রেস এজেন্সি : এবারের সেপ্টেম্বরে মোদি নাকি খুবই সফল প্রধানমন্ত্রীর মতো জাতিসঙ্ঘে বক্তৃতা রেখেছেন। অন্তত কলকাতার আনন্দবাজারের চোখে। উগ্র হিন্দুজাতিবাদী অবস্থানের আনন্দবাজার এবার প্রকাশ্যেই হিন্দুত্ববাদের অবস্থান নিয়েছে। ভারতের সীমান্ত সঙ্ঘাতের এই ‘মোক্ষম সময়ে’ প্রধানমন্ত্রী মোদি নাকি ভারতের ‘নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো ভাবে তুললেন’- এভাবে লিখেছে আনন্দবাজার।

কিন্তু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি কী সেটা ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ বুঝেছেন এমন প্রমাণ নেই। ফলে কেবল আনন্দবাজারও বোঝেনি তাও নয়। আসলে এখনো যারা ‘জাতিরাষ্ট্র চিন্তার’ রাজনীতিতে আছেন এটা তাদের বুঝের বাইরে থেকে যাবে, আমরা ধরে নিতে পারি। এছাড়াও এরা যদি হিটলারের মতো আরো উগ্র-জাতি চিন্তার হন তো কথাই নেই। যেমন ছিল জাতিসঙ্ঘে মোদির এই বক্তব্য। বাস্তবত জন্ম থেকেই ভারত জাতিসঙ্ঘ কী তা বুঝেইনি। অন্তত দুটো পয়েন্ট থেকে তা বলা যায়।

এক. জাতিসঙ্ঘ সেই পথচিহ্ন-মার্ক যখন ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণার নিকৃষ্ট পরিণতি হিসেবে হিটলারের জার্মানির উত্থান ও যুদ্ধের ধ্বংসলীলা যা সারা ইউরোপ দেখেছিল। দেখে ইউরোপের ৪৫ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে (১৯৫৩ সালে) জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র ত্যাগ করে অধিকারভিত্তিক ও নাগরিক বৈষম্যহীনতার প্রতিশ্রুতিতে সাম্যের রাষ্ট্র হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর ভারতের কোনো রাজনীতির ধারাই বা রাজনীতিবিদ তা টেরও পায়নি।

একাডেমিকরাও এর খবর এখনো পেয়েছেন এমন জানা যায় না। ভারতে ‘জাতীয় স্বার্থ’ কথাটা রীতিমতো দানবীয়। এই শব্দ দিয়ে আপনি প্রধানমন্ত্রী বা সম্পাদক যেকোনো ডাহা মিথ্যা বলে যেতে পারেন। জাতীয় স্বার্থের খাতিরে সব জায়েজ থাকবে। এমনকি মুসলমান বা দলিতের ওপর জুলুম অত্যাচার হত্যা সব করতে পারবেন। এই হলো বর্ণহিন্দুর চরম রেসিজমের একালের ভারত। হতে পারে এই জাতীয়স্বার্থ ভঙ্গের ভয়ে একাডেমিকেরাও ভারত জাতিরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চান না।

দুই. জাতিসঙ্ঘ জাতিরাষ্ট্র ধারণার ওপর কখনোই দাঁড়ানো নয়। এজন্য জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরের সমাধান করতে বলেছিল রাজার ইচ্ছা নয়, কাশ্মির ভূখ-ের বাসিন্দাদের ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার রায় দিয়েছিল। নেহেরু তা করেন নাই, মোদি পর্যন্তও কেউ না। সারা ভারতের রাজনীতি মনে করে হিন্দুত্ব ও জাতিরাষ্ট্র ধারণাটাই রাজনীতি।

তিন. একালে জাতিসঙ্ঘে ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার লোভ জেগেছে ভারতের। আর তা জাগিয়েছে আমেরিকা। চীন ঠেকানোর খেপে ভারতকে নিয়োগ করার জন্য এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকা। তামাসা হলো ভারত সেটা বিশ্বাস করেছে।ব্যাপার হলো, ভেটো সদস্যপদ দেয় কে? এটা ভারতের আর জানাই হলো না। একালে মোদিও তাই বলছেন, ‘আর কত দিন রাষ্ট্রপুঞ্জের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে ভারত?।’ কিন্তু মোদি এটা কার কাছে চাচ্ছেন? জাতিসঙ্ঘ না আমেরিকা নাকি চীন?

প্রথম কথা, এটা রাষ্ট্রের মুরোদের প্রশ্ন যে কে কাকে সদস্যপদ দিতে পারে। আমেরিকার সে মুরোদ সত্তর বছর পরে এখন প্রায় শুকিয়ে আসছে। এটা বুঝা কী খুব কঠিন? দ্বিতীয়ত ভেটো সদস্যের পাঁচ দেশের তালিকা বদলাবে না যতক্ষণ না নতুন গ্লোবাল নেতা কেউ আসছে। এটা হবে তার ইচ্ছা এখতিয়ার। তার সাথে অন্যদের সম্পর্কের মাত্রার ওপর নির্ভর করবে আর কোন রাষ্ট্র নতুন করে ভেটো ক্ষমতা পাবে। যদি সে নেতা চীন হয়, তবে তাই।আজকের ভারত এই হিন্দুত্ববাদী হিটলারকে চীন কেন সদস্যপদ দিতে যাবে, না অন্য কেউ দেবে? আর তবু সেজন্য অন্তত কিছু রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও কমিটমেন্ট তো ভারতের লাগবে! কেবল হিন্দুত্বের জন্য যে ভারত নিজ দেশের অন্যান্য নাগরিকের প্রতি বৈষম্যহীন আচরণ করতে পারে না সেই ভারতকে কে এবং কেন ভেটো সদস্যপদে টেনে তুলবে?

আবার মোদির ধারণা দেখেন, তিনি বক্তৃতায় বলেছেন, ‘জাতিসঙ্ঘ এবং ভারতের মূল আদর্শ নাকি এক।’ ‘বসুধৈব কুটুম্বকম (গোটা বিশ্বই আত্মীয়) এই মন্ত্র রাষ্ট্রপুঞ্জের সভায় বার বার’ নাকি জাতিসঙ্ঘে উচ্চারিত হয়ে থাকে। অথচ মোদির ভারত হলো এমন, যে হিন্দু নয় বা যার হিন্দুত্ব নেই এমন কাউকে সে সহ্য করতে পারে না। সেই মোদি এমন ফাঁপা আওয়াজ দিচ্ছে।
দেখা যাচ্ছে এটাই ভারতের জাতিসঙ্ঘ রিডিং!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

বিডিপ্রেস এজেন্সি/আইজেএস

আরও পড়ুন...