ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা, নিরব প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক,বিডিপ্রেস এজেন্সি,ভূরুঙ্গামারী,কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কৃষি জমিতে ব্যাঙের ছাতার মত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রচুর লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা। এইসব ইটভাটায় মানা হচ্ছেনা কোন আইন কানুন। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই স্বদর্পে চালিয়ে যাচ্ছে ব্যবসা। পুড়ছে ফসলি জমির ঊর্বর মাটি। কার্বন ডাই-অক্সাইড মিশ্রিত কালো ধোঁয়ার বিষ ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র । ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে এলাকার পরিবেশ। উপজেলা সদরের প্রধান প্রধান সড়কের কোল ঘেসে গড়ে উঠলেও অজ্ঞাত কারনে প্রশাসন পালন করছে নীরব ভূমি উপজেলায় ১০টি ইটভাটা থাকলেও এর লাইসেন্স নবায়নে সংশ্লিষ্ট মহল সমূহের দেয়া তথ্যের ভিন্নতায় জনমনে দেখা দিয়েছে সত্য জানার আগ্রহ। পরিবেশ অধিদপ্তর রংপুর অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কোনো ইটভাটারই পরিবেশ অধিদপ্তরের হালনাগাদ ছাড়পত্র নেই। শুধুমাত্র খোকন ট্রেডার্স নামের একটি ইটভাটার ১৭ জানুয়ারি ২০ সাল পর্যন্ত ছাড়পত্র ছিল। এখন একটিরই নেই।

সরেজমিনে গিয়ে ১০টি ইটভাটার অস্তিত্ব মিলেছে ভূরুঙ্গামারীতে। কোনটি কৃষিজমিতে, কোনটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে, কোনটি আঞ্চলিক মহাসড়কের কোলে, অপরিকল্পিতভাবে ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকায়ও গড়ে উঠেছে এসব ইটভাটা। অথচ ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাহাড়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং লোকালয়ের ৩ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটা করা যাবে না। কৃষিজমিতে ইটভাটা তৈরীর আইনগত বিধি নিষেধ রয়েছে। এমনকি ভাটায় নিয়োজিত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিরও আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দৃশ্যপটে বিপুল পরিমান ফসলি জমি নষ্ট করে ‘‘টপ সয়েল” নামে পরিচিত জমির উপরিভাগের মাটি কেটে ট্রাক্টর দিয়ে এনে তৈরি করা হচ্ছে ইট ।

প্রায় প্রতিটি ইটভাটার পাশেই রয়েছে কৃষি জমি। এই কৃষি জমির বেশীরভাগ মালিকরা জানেই না সরকার তাদের জমির সুরক্ষার জন্য করে দিয়েছে আইন, বেঁধে দিয়েছে নিয়ম, নীতিমালা। পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় তাদের অভূতপূর্ব ক্ষতি হলেও ইটভাটার মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকাবাসী প্রশাসনের কোনো দপ্তরে অভিযোগ দিতে সাহস পায়না। অনেক বছর ধরে ইট উৎপাদন ও বিক্রির কাজ চালিয়ে গেলেও এসব ভাটায় নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স এবং অনুমতি সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন করেই চলছে ভাটাগুলো । প্রতিটি ভাটার পাশে স্তুপ করে রাখা হয়েছে মাটি। ভাটার মাটি আনা এবং ইট বিক্রির কাজে ব্যবহৃত ট্রাক ও ট্রাক্টরের ঘন ঘন যাতায়াতের কারণে শব্দ দূষনের কবলে পড়ছে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ্যরা। হুমকির মুখে পড়ছে পথচারী, স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী। দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে সড়ক, এর কালো ধোঁয়ায় ফসলসহ পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে অপূরণীয়। স্থাপিত ইটভাটা এলাকার কৃষক জুলহাস, আকরাম ও ফয়েজ উদ্দিন বলেন, কয়েক বছর আগেও যে জমিতে আমরা ফসল উৎপাদন করেছি এখন সেখানে হয়েছে ইট ভাটা। এতে তাদের চাষাবাদ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ভাটায় ব্যবহৃত চিমনি দিয়ে নির্গত ধোয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে শত শত বিঘা ফসলি জমি।

চাইলে এল.এম.বি ব্রিক্সের সত্ত্বাধিকারী লিয়াকত আলী মোল্লা বলেন,তার ইট ভাটার লাইসেন্স নবায়ন না থাকলেও তিনি সরকারী বিধি মেনে এক ফসলী জলডোবা জমিতে জিগজাগ চিমনি ব্যবহার করে ভাটাটি পরিচালনা করছেন। এক প্রশ্নের জবাবে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা ইট ভাটা মালিক সমিতির আহবায়ক ও কাজী ব্রাদার্স ব্রিক্সের স্বত্ত্বাধিকারী কাজী গোলাম মুস্তফা বলেন, আমার জানা মতে পাঁচটি ইটভাটার লাইসেন্স আছে কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর ইটভাটার লাইসেন্সের নবায়ন না দেয়ায় চলতি বছর কোন ভাটার লাইসেন্স নবায়ন হয়নি।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম সায়েম বলেন, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে কাজ করলে ইটভাটায় নিয়োজিত শ্রমিকদের শ্বাসকষ্ট, ডাচ এলার্জি, ফুসফুসের সংক্রমনসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। ঊপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, বিপুল পরিমান কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে অপরিকল্পিত ভাবে এইসব ইট ভাটা গড়ে ওঠায় । ভাটায় ইট তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে ফসলি জমির টপ সয়েল। ফলে একদিকে কৃষক হারাচ্ছে বড় অংশের কৃষি উপযোগি জমি অন্য দিকে ভবিষ্যতে দেখা দিতে পারে ফসল উৎপাদনের লখ্যমাত্রা পুরণ না হওয়ার সম্ভবনা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব শর্মা বলেন, ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ১০ টি ইটভাটা রয়েছে। ভাটার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয় জানেন। পরিবেশ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের সহকারি পরিচালক ইউছুফ আলী বলেন, ইতোমধ্যে আমরা কয়েকটি উপজেলায় বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়েছি। আমরা সব উপজেলাতেই এই ধরনের অভিযান চালাব। কেউ যদি আইন অমান্য করে ইটভাটা চালায় তাহলে সঠিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোঃ রেজাউল করিম বলেন, ভূরুঙ্গামারী উপজেলার দশটি ইটভাটার মধ্যে সাতটির লাইসেন্স নবায়ন আছে। বিধিমালা লংঘন করে কেউ ইটভাটা পরিচালনা করলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বিডিপ্রেস এজেন্সি/টিআই

আরও পড়ুন...