বৈশাখী…

ফাইল ফটো। 

আমরীন মেহবুবা সুলতানা : এইবার আমারে দেহিস, ফুলের এমন মালা পরমু যে নায়িকার লাহান লাগবো আমারে। কেন বুবু, গতকালকে আমরা একই ফুল কুরাইসি। তো আমারে সুন্দর লাগবো না কেন? আরে কই যাস, তোরে সুন্দর লাগবে তো, মন খারাপ করস কেন? বেশিদূর যাস না কিন্তু। নতুন ফুল দিয়া বুবুর চেয়েও সুন্দর মালা আমি বানামু। মা যেই ম্যাডামের বাসায় কাম করতো সেই বাড়ির বারান্দায় তো অনেক সুন্দর ফুল আছে। যাই কিছু ফুল লইয়া আসি। কিরে তুই কই গেছিলি, এত সুন্দর ফুল কই পাইলি? তোর লাইগা মা কাম থেকে আইসা আমারে বক্তাছে। তাড়াতাড়ি মালা গাথঁ, ভোরে উইটাই তো মালা বেঁচতে যাইতে হইবো।

বুবু, বৈশাখীতে সবাই লাল জামা পড়ে কেন? আমাদেরও তাহলে কালকে লাল জামা পড়তে হইবো? তুইতো ঠিক কথাই মনে করছিস। কিরে কি কস্ তোরা? আমার কাম করতে করতে জান জাইতেসে, আর তোরা দেখোস না কতো মানুষ করোনাতে মরতেছে। আর তোরা আসোস জামা লইয়া। মা এমনে কথা কও কেন? আমাদের বাপ বাঁইচা থাকলে তো ঠিকই ভ্যান থাইক্যা নতুন জামা লইয়া দিতো। গেলো বছর তোর বাপ আমাদের ছাইড়া চইলা গেল। করোনা তোর বাপকে আমাদের থাইকা লইয়া গেছে। যেই শুনে করোনা হয়ে মারা গেছেন, বলে এইখানে কবর দিতে পারবেন না, অন্য জায়গায় যান। তারপর কত দূরে যে তোর বাপকে কবর দিছি, এরপর থাইকা আমাদের ঘরে অভাব ছাড়ে না।

তোদের নতুন কাপড় কেমনে দিমু বল, যেখানে আমাদের খাওনের টাকাই ঠিকমতো জোগাড় হয় না। আমাগো কিছু লাগবোনা মা কিন্তু আমাগো একা রাইখা বাপের মত তুমিও চইলা যাইও না। আর শোন তুই মন খারাপ করিস না। কালতো বৈশাখ, এই ফুলের মালা বেঁইচা আমরা যেই টাকা পামু ওইটা দিয়া তোরে একটা সুন্দর ফ্রক কিনে দিমু। আর মিঠাইও খামু। আর এই দিনে তো সব লোকে আমাদের লাহান পান্তা ভাত খায়, আমরাও খামু। বিহালে ঝিল পাড়ে যে মেলা বসে ঐখানেও যামু। এই ফুলের মালা গুলা বেঁচবার পারলেই সব কিছু করতে পারমু। এখন শুইয়া পড় বইন সহালে উঠতে হইব যে, আর দেরি করিস না।

বুবু তাড়াতাড়ি উঠো, সকাল হইয়া গেছে, আমাদের সাজোন লাগবো না? আমাদের মালাগুলো লোকে কিনব তো বুবু? কিনবো না কেনো, তুই তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নে বার হইতে লাগবো। চারদিক এত ফাঁকা কেন বুবু, রাস্তায় লোক নাই কেন, আমরা কি ভুল দিনে বার হইছি? আরে না সহাল তো আর একটু বেলা হোক মানুষে ঠিকই আসবো। তুই আর একটু সামনে যাইয়া পেপার বিছাইয়া বস্, কেউ আইলে বড়টা ২০ টাহা, আর ছোটটা ১৫ টাহায় বেঁচবি। আমি বাকি মালাগুলো লইয়া আইতেসি।

কি হলো, কোন মাইনষে আজ রাস্তায় নামে না কেন? পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, ডরও লাগতাছে। বুবু, কেউ মালা কিনতে আসে নাই। পুলিশ বার বার আইসা তারা দিতেসে। চল বুবু আমরা চইলা যাই। আরে না, যামু কেন? আরেকটু সামনে গিয়ে বসি চল। বুবু দেহো, পুলিশ আইতাসে। কিরে তোদের বলিনি এখান থেকে চলে যেতে? স্যার একটু বসতে দেন না, এই ফুলের মালা গুলো বেইচা চইলা যামু। তোরা উঠবি নাকি তোদের থানায় নিয়ে যাব। বুবু চইলা যাই, নইলে স্যার আমাদের মারবো। একটা মালাও বেঁচবার পারলাম না। আমাদের তো কত শখ কাছে কিন্তু টাহা নাই। চল্ একটা গলিতে গিয়ে বসি যদি কেউ ফুলের মালা কিনে।

বুবু লকডাউন এর লাইগা তো কেউ ঘর থেকে বার হয় না, আমাদের মালা কিনব কেমনে? কিরে তোর কি হয়েছে সকাল থেইকা এতো কাশতেসোস কেন, ঠান্ডা কিছু খাস নাই তো? না বুবু গতকাল রাত থাইকা খালি কাশি আসতেছে। এইডা পুলিশের গাড়ি না, আমাদের দিকে তো আসতেছে। চল তাড়াতাড়ি পালাই, ধরবার পারলে থানায় লইয়া যাইব। আরে ফুল লওন লাগব না। বুবু আমরা গরিব হয়ে জন্মাইসি কেন? আল্লাহপাক যদি আমাদের টাহা দিত তাহলে এত কষ্ট করতে হইতো না। চল বাসায় যাই বিহালে তোকে মেলায় লইয়া যামু।

মা খাওন দাও, শুধু পান্তা ভাত আছে, আর কিছু নাই? অল্প কিছু টাকা দিয়া পুরা মাস চলন লাগবো, এখন এইটাই খাইয়ালো। দৌড়াতে দৌড়াতে কোমরটা ধইরা গেছে, চল একটু শুইয়া লই। কিরে তোর গায়ে তো ভীষণ জ্বর। তুই কি করছিস তোর জ্বর আসছে কেমনে? সত্যি কইরা ক তো গতকাল বিহালে কোথায় গেছিলি? মা যেই বাসায় কাম করতো ওই বাসা থেকে ফুল আনতে গেছিলাম।

কি কস তুই, ওই বাড়িতে তো সবার করোনা হয়েছে, এজন্যই তো কাম ছাড়সি। মা চলো ওরে হাসপাতালে লইয়া যাই। বইন তুই চিন্তা করিস না তোর কিছুই হবে না। ডাক্টার সাব আমার বইন টারে একটু দেহেন না ও শ্বাস নিবার পারতাছেনা। কোনো বেড তো ফাঁকা নাই, ওকে বারান্দায় শুওয়াও আমি দেখছি। ওর অবস্থা তো অনেক খারাপ আইসিইউতে নিয়া দরকার। কিন্তু কোন আইসিইউ বেড তো ফাঁকা নাই, তারাতারি উনাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। বইন তর কিছুই হবে না, দেহিস, তুই ঠিক হইয়া যাবি। তুই, কথা কস্ না কেন?

আমরা মালা বানাইসি না, ওইগুলা পইরা তো মেলায় যামু। উঠ্ না বইন, স্যার দেহেন না আমার মাইয়াটা কথা কয় না কেন? স্যার ওর শরীর ঠান্ডা হইয়া গেছে কেন? ডাক্তার সাব আপনি চুপ কইরা আছেন কেন, চইলা যাইয়েন না স্যার, কিছু কইয়া তো যান। মা, আল্লাহ্ আমার বইনটারে লইয়া গেছে। আমরা কি পাপ করছি মা, গেলো বছর করোনায় আমার বাপ মইরা গেলো, এহন বইনটাও আমাদের ছাইড়া চইলা গেলো। আমরা কি নিয়া বাঁচমু মা। আমার বইনরে আমি কবরে শুয়াইতে পারমু না, মা। আমরা কি করমু বল, আল্লাহ্ আমারে নিতো, আমার মাইয়াটারে কেন নিলো। তুই কথা দে, কাওরে কোবিনা যে তর বইন করোনায় মরছে, তাইলে তর বাপের লাহান বইনরেও মাইনসে এইহানে কবর দিতে দিবো না।

লেখক : শিক্ষার্থী।  

বিডিপ্রেস এজেন্সি/জান্নাতুল মুক্তা

আরও পড়ুন...