বিশ্বে ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা এয়ারলাইন্সের মধ্যে ইউএস-বাংলা অন্যতম

লেখকের ছবি।

মোঃ কামরুল ইসলাম : বিশ্বে ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা এয়ারলাইন্সের মধ্যে ইউএস-বাংলা অন্যতম প্রতিবছর সারাবিশ্বে অনেক এয়ারলাইন্স কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সব এয়ারলাইন্সের এয়ারক্রাফট যে আকাশে উড়তে পারে তা কিন্তু নয়। অনেক কোম্পানী আকাশে উড়ার আগেই মুখ থুবরে পড়ে যায়। অনেক এয়ারলাইন্স বিভিন্ন দেশের সিভিল এভিয়েশন থেকে এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) নিয়ে থাকে কিন্তু আকাশে এয়ারক্রাফট উড়ানোর সুযোগ পায় না। এয়ারলাইন্স কোম্পানীগুলো সংশ্লিষ্ট সিভিল এভিয়েশন থেকে এয়ারক্রাফট সংগ্রহের পর এওসি (এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট) নিয়ে থাকে।

অনেক এয়ারলাইন্স ফ্লাইট চলাচল শুরু করার পর খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ব্যবসার শেষটাও দেখে ফেলে। সারাবিশ্বের বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরু হওয়ার পর প্রায় ৫হাজার এয়ারলাইন্স আইকাও কোড নিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ৭৭০ থেকে ৮০০টি এয়ারলাইন্স সারাবিশ্বে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। মাঝে মাঝে বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা করোনা ভাইরাসের মতো মহামারীর কবলে পড়ে অনেক এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে গেছে। নিজেদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, এয়ারক্রাফট চয়েস, রুট নির্ধারণ, আর্থিক সংকট কিংবা এভিয়েশন পলিসির সাথে লড়াই করে শেষ অবধি টিকে থাকতে পারেনি বিশ্বের বহু এয়ারলাইন্স।

২০১৪ সালে বিশ্বের বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে। কিন্তু সবগুলো এয়ারলাইন্স আজ অবধি ফ্লাইট পরিচালনা করছে তা কিন্তু নয়। কয়েকটি এয়ারলাইন্স তাদের বহরে যেমন নতুন নতুন এয়ারক্রাফট যুক্ত করেছে আবার প্রতিবছরই নতুন নতুন গন্তব্য সম্প্রসারন করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দু’টি ড্যাশ ৮- কিউ৪০০ এয়ারক্রাফট নিয়ে ঢাকা থেকে যশোর রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে ২০১৪ সালে ১৭ জুলাই। বর্তমানে ইউএস-বাংলার বিমান বহরে ৭টি ব্র্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০, ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০সহ মোট ১৪টি এয়ারক্রাফট রয়েছে। ৮টি অভ্যন্তরীণ, ৯টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যসহ মোট ১৭টি গন্তব্য রয়েছে।

দুবাই, দোহা, মাস্কাট, গুয়াংজু, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, চেন্নাই ও কলকাতায় ফ্লাইট পরিচালনা করছে। খুব শীঘ্রই মালে, কলম্বো, জেদ্দা, দাম্মাম, রিয়াদে ফ্লাইট শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বহরে বেশ কয়েকটি এয়ারক্রাফট যুক্ত করারও পরিকল্পনা আছে। একই বছর যাত্রা শুরু করা ইউএস-বাংলা ছাড়াও বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্স বিশ্ব এভিয়েশনে প্রতিযোগিতা করে টিকে আছে। বিভিন্ন দেশে নেতৃত্বস্থানীয় এয়ারলাইন্স হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে চীনের হাইনান এয়ারলাইন্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান উরুমকি এয়ার ১৭ টি এয়ারক্রাফট নিয়ে ৩১টি গন্তব্যে লো কষ্ট এয়ারলাইন্স হিসেব নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।

১৮ মে ২০১৪, কুনমিং থেকে মাংশিতে উদ্বোধনী ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে রুইলি এয়ারলাইন্স চীনের আকাশে মধ্যম সারির এয়ারলাইন্স হিসেবে চায়না ইষ্টার্ণ, চায়না সাউদার্ণ কিংবা চায়না এয়ারলাইন্স এর সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে আছে। বর্তমানে রুইলি এয়ারলাইন্স এর ২১ টি এয়ারক্রাফট আছে, যা দিয়ে ৩৪টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বিশ্ব এভিয়েশনে চীনের এয়ারলাইন্সগুলো একটিা স্থিতিশীর অবস্থায় আছে। কারন হিসেবে নিজেদের মার্কেট শেয়ার নিজস্ব এয়ারলাইন্সগুলো ধরে রেখেছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চায়না সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ শানডং প্রদেশে ২৬ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে চায়নার অন্যতম নানশান গ্রুপের কিংদাও এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে।

২৮ এয়ারক্রাফট দিয়ে ২৪টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে কিংদাও এয়ারলাইন্স। এছাড়া একই বছর এয়ার চায়না ইনার মঙ্গোলিয়া যাত্রা শুরু করে। যার ৮০% শেয়ার এয়ার চায়নার আর ২০% শেয়ার ইনার মঙ্গোলিয়ার। ভারতের টাটা গ্রুপের নিয়ন্ত্রনাধীন এয়ার এশিয়া ইন্ডিয়া ১২ জুন ২০১৪ তে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। টাটা গ্রুপের শেয়ার রয়েছে ৮৩.৬৭%। বর্তমানে ৩৪টি এয়ারক্রাফট রয়েছে, যা দিয়ে ২০টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এয়ার এশিয়া ইন্ডিয়ার প্রধান কারযালয় বেঙ্গালুরু। একই বছর আগষ্টে আমেরিকার সুপরিচিত হোল্ডিং কোম্পানী ওয়েস্টার্ণ গ্লোবাল নিজ নামেই ফ্লোরিডাতে একটি এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠিত করে। যার বর্তমানে ১৯টি এয়ারক্রাফট রয়েছে।

সেন্ট কিটস এন্ড নেভিসে ১৬ জুলাই ২০১৪ ফনিক্স এয়ার ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে যাত্রা করে। ৭টি এয়ারক্রাফট দিয়ে ক্যারাবিয়ান অঞ্চলে ৭২ গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। রাশিয়ার মস্কোতে এরোফ্লোট নিয়ন্ত্রনাধীন পোবেদা এয়ারলাইন্স ৪৩টি এয়ারক্রাফট নিয়ে ৬৭ টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম লো-কষ্ট এয়ারলাইন্স হিসেবে সুপরিচিতি পেয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ডেনমার্কের স্কাই গ্রিনল্যান্ড ছোট পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এছাড়া গ্রীসের মেসোডোনিয়াতে ইলিন এয়ার, যার রয়েছে ৫টি এয়ারক্রাফট ও ২০টি গন্তব্য। একই বছর আফ্রিকায় বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এয়ারলাইন্সগুলো হচ্ছে- কেনিয়ার জাম্বোজেট, মালাউই এয়ারলাইন্স। ১৬ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে যাত্রা শুরু করা দক্ষিণ আফ্রিকার জোহাননেসবার্গে ফ্লাই সাফাইর বর্তমানে ১৮টি এয়ারক্রাফট নিয়ে ৯টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

২০১৪ সালে এশিয়ায় বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্স ছোট পরিসরে শুরু করে। যার মধ্যে অন্যতম- নেপালের সাউরিয়া এয়ারলাইন্স ৩টি এয়ারক্রাফট ও ৬টি গন্তব্য, মায়ানমারের মান ইয়াদানারপন এয়ারলাইন্স ৩টি এয়ারক্রাফট ও ১৫টি গন্তব্য, ইন্দোনেশিয়ার মাই ইন্দো এয়ারলাইন্স ৩টি এয়ারক্রাফট ও ৫টি গন্তব্য, কিরগিস্তানের তেজ জেট এয়ারলাইন্স যার রয়েছে ৩টি এয়ারক্রাফট ও ৬টি গন্তব্য। একই বছর চায়না এয়ারলাইন্সের অধীনে ২৬ সেপ্টেম্বর টাইগার এয়ার তাইওয়ান যাত্রা করে। বর্তমানে ১৩টি এয়ারক্রাফট ও ২১টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে এয়ারলাইন্সটি। যাত্রা শুরু আর শেষের মধ্যে সময়ের ব্যবধান মাত্র এক বছর কিংবা তার চেয়েও কম সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্স। কম্বোডিয়ার অপ্সরা ইন্টারন্যাশনাল এয়ার, রোমানিয়ার ফ্লাই রোমানিয়া, জর্জিয়ার ফ্লাই ভিস্তা, ক্রোয়েশিয়ার ইউরোপিয়ান কোস্টাল এয়ারলাইন্স, মাল্টার হার্মেস এভিয়েশনসহ আরো বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্স স্বল্পতম সময়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।

কোভিড-১৯ মহামারিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে না পেরে শেষ পরযন্ত দু’টি স্বনামধন্য এয়ারলাইন্স বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে, যারা ২০১৪ সালে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছিলো। এর মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্রের অহনা এয়ারলাইন্স যা হাওয়াইজিয়ান এয়ারলাইন্স কর্তৃক পরিচালিত ছিলো। প্রায় সাত বছর ফ্লাইট অপারেশনে ছিলো সাতটি এয়ারক্রাফট নিয়ে। এছাড়া এশিয়ার অন্যতম থাইল্যান্ডের নোকস্কুট বন্ধ হয়ে যায় সাত বছর পর। নোকস্কুটে প্রায় ৪৫০ জন কর্মী ছিলো। ২০১৪ তে শুরু হয়ে দুই-তিন বছর পর বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইন্স এর সংখ্যাও কম নয়।

তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আফগানিস্তানের আফগান জেট ইন্টারন্যাশনাল, কাতার এয়ারওয়েজের মালিকাধীন আল মাহা এয়ারওয়েজ, যুক্তরাষ্ট্রের মিশৌরী অঙ্গরাজ্যের বাজ এয়ারওয়েজ, কম্বোডিয়া বায়ন এয়ারলাইন্স, তাইওয়ানের ভি এয়ার ও জিম্বাবুয়ি ফ্লাইট আফ্রিকা ডট কম। সারাবিশ্বের আকাশপথে বিচরণ করা এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে ২০১৪ সালে উড্ডয়ন শুরু করা এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, ভারতের এয়ার এশিয়া ইন্ডিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্লাই সাফাইর, তাইওয়ানের টাইগার এয়ার তাইওয়ান, রাশিয়ার পোবেদা আর চীনের রুইলি এয়ারলাইন্স, কিংদাও এয়ারলাইন্স, উরুমকি এয়ার অন্যতম।

বাংলাদেশের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দেশের আকাশপথে বেসরকারী এয়ারলাইন্স হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে এশিয়ার একটি অন্যতম এয়ারলাইন্সে হওয়ার প্রতিযোগিতা করছে। আশা করছি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বাংলাদেশের এভিয়েশন মার্কেটের স্থিতিশীলতা বজায় রেখে প্রত্যক্ষভাবে ট্যুরিস্ট সেক্টরের গতিশীলতায় ভূমিকা রাখবে।

লেখক : মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ), ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

বিডিপ্রেস এজেন্সি/এনআই

আরও পড়ুন...