বাংলাদেশে গণমাধ্যমের প্রভাব

তামীমদারী সৌমিক : গণমাধ্যম আধুনিক সমাজের একটি অপরিহার্য অংশ।যেকোনো জ্ঞানভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যম তথ্য ও জনগণের মতামত, বিশ্বাস গঠন ও পরিবর্তনে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।প্রতিটি গণমাধ্যমের নিজস্ব নীতিমালা আছে, আছে সম্পাদকীয় আদর্শ বা সিদ্ধান্ত। গণমাধ্যমের নিজস্ব সব সিদ্ধান্ত বা আদর্শের বাইরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বা চেতনা আছে, সেটি হচ্ছে, সত্যের প্রতি একাগ্রতা ও সত্যের অনুসন্ধান।গণমাধ্যমভিত্তিক যে তথাকথিত গণতান্ত্রিক সমাজে বর্তমানে আমরা বাস করি, সেখানে জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য গণমাধ্যমগুলো আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে।

গণমাধ্যম সম্পর্কে থাকা হরেক তত্ত্বের কোনোটি বলে, গণমাধ্যমে মানুষ যা দেখে বা শোনে তা-ই বিশ্বাস করে৷ আবার কোনো তত্ত্ব অনুসারে, মানুষ গণমাধ্যম থেকে সেই কনটেন্ট বা আধেয়টাই গ্রহণ করে যেটা সে গ্রহণ করতে চায়৷ কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, গণমাধ্যমের আধেয় যেমন সমাজকে প্রতিফলিত করে, তেমনি আধেয়টির দর্শক-শ্রোতাকে কমবেশি প্রভাবিত করার সুযোগ থাকবেই, যার প্রতিফলন হবে সমাজের ওপর৷

ছোট্ট একটা উদাহরণ : কোনো এনার্জি ড্রিংকের বিজ্ঞাপনে নাকি বলেছিল, এটা খেলে ব্রেইন খোলে, সতেজ থাকে৷ তাই এক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি কারও নিষেধ না শুনে চোখের সামনেই তাঁর মাত্র স্কুলজীবন শুরু করা বাচ্চা ছেলেটাকে এনার্জি ড্রিংক কিনে খাওয়ানো শুরু করলেন! টানা কয়েক মাস বোঝানোর পর ধীরে ধীরে তিনি নিমরাজি হয়ে এ কাজ বন্ধ করলেন ঠিকই৷ কিন্তু ততদিনে বাচ্চাটাকে সেই এনার্জি ড্রিংক আসক্তির মতো ধরে ফেলেছে৷

গণমাধ্যমের প্রভাববিষয়ক শুরুর দিকের গবেষণাগুলো, বিশেষ করে ম্যাজিক বুলেট-তত্ত্ব, জনগণের ওপর গণমাধ্যমের সরাসরি প্রভাবকে গুরুত্ব দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, জনগণের ওপর গণমাধ্যমের প্রভাব ঠিক ততটা সর্বজনীন নয়। জনগণ তাদের পছন্দমতো গণমাধ্যম ব্যবহার করে। অর্থাৎ জনগণ নিজেরাই ঠিক করে তারা কী দেখবে আর কী বর্জন করবে। কিন্তু সমাজ যত তথ্য ও গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হতে শুরু করে, তথ্য যত বেশি জীবনযাপনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠতে থাকে, জনগণেরও গণমাধ্যম নির্ভরশীলতা তত বাড়তে শুরু করে।

এই নির্ভরশীলতার সুযোগে, বিশেষ করে আধিপত্য ও ক্ষমতা বিস্তারের জন্য গণমাধ্যম স্বউদ্যোগে ভূমিকা নিতে শুরু করে। বলা হয় যে মিডিয়ার ওপর এখন জনগণের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই—মালিক ও ব্যবস্থাপকেরাই বিজ্ঞাপন আকর্ষণের চেষ্টা করেন এবং নির্ধারণ করেন কী পরিবেশন করা হবে, আর জনগণকে অবশ্যই সেগুলোর ভেতর থেকেই পড়া বা দেখার জন্য বাছাই করতে হয়। জনগণ স্বভাবতই অনেক কিছু পড়ে বা দেখে তার কারণ সেগুলো অনায়াসে পাওয়া যায় এবং সেগুলোই তাদের সামনে তুলে ধরা হয়।

আবার,সাম্প্রতিককালে গোটা বিশ্ব, বিশেষ করে বাংলাদেশেও, গণমাধ্যমের এই এজেন্ডা নির্ধারণ এবং সেই বিষয়ে জনগণের কাছ থেকে সম্মতি অর্জনের প্রচেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিতর্ক উঠেছে কোনো ঘটনা বা সংবাদের নেতিবাচক প্রচারণার ক্ষেত্রে এখন শুধু সরকার, প্রতিষ্ঠান বা সাংবাদিকের নিজস্ব সেন্সরশিপই কাজ করছে না; বরং গণমাধ্যমের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এজেন্ডা নির্ধারণ এবং সেই এজেন্ডার পক্ষে সম্মতি গঠনের জন্য প্রচারণাও অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বা কোনো সংঘাতের সময়ে গণমাধ্যম কীভাবে মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করেছে।

ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ এবং তা প্রচার ও প্রসারের জন্য গণমাধ্যমগুলো একধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। গণমাধ্যমই এখন এজেন্ডা ঠিক করছে, জনগণ কোন বিষয়ে প্রাধান্য দেবে, আলোচনা করবে।সমসাময়িক বাংলাদেশের মিডিয়া গুলোতে মিডিয়া তত্ত্বের দ্বি-ধাপ তত্ত্ব, এজেন্ডা সেটিং-তত্ত্ব ও চাষাবাদ তত্ত্বের প্রভাব বেশি লক্ষ্য করা যায়।

গণমাধ্যম যত সমাজে ক্ষমতার নিয়ামক হয়ে উঠতে থাকে, দেশ ও জনগণের ওপর এর প্রভাবের ধরন তত বদলে যেতে থাকে। ‘ওয়াচডগের’ পরিবর্তে গণমাধ্যম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে থাকে, গণমাধ্যম নিজেরাই ইস্যু তৈরি করে, সেই ইস্যুর পক্ষে বা বিপক্ষে নেতিবাচক প্রচারণা চালায় বা চালানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। সমাজে প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ যত বেড়েছে, গণমাধ্যম যত মানুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে, তার একচ্ছত্র আধিপত্য তত বেড়েছে। এই ক্ষমতার বিস্তার মানুষের মনোজগতে, আচরণে পরিবর্তন আনছে।

কতটুকু সফল হচ্ছে সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ কিন্তু গণমাধ্যমের এই ভূমিকা যেমন আমরা পশ্চিমা বিশ্বে দেখেছি তেমনি দেখছি বাংলাদেশেও। বিশেষ করে সংঘাত, সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের এজেন্ডা নির্ধারণ এবং সেই এজেন্ডার পক্ষে বা বিপক্ষে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা গণমাধ্যমের ভূমিকাকে করে তুলছে বিভ্রান্তিকর। গণমাধ্যম যখন মানুষের চিন্তার দিক, পরিসর ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন গণমাধ্যমের ভূমিকা হয়ে ওঠে ঈশ্বরের সমতুল্য।

গণমাধ্যম যখন জনগণকে বিশেষ উদ্দেশ্যে পরিচালনা করতে চায়, তাদের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করতে চায় বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ইস্যু নির্ধারণ করে, মানুষও ওই একই ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে। এজেন্ডা সেটিং-তত্ত্বের মাধ্যমে সেটিকে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

গণতান্ত্রিক সমাজে স্বতঃসিদ্ধ বিশ্বাসটি এমন যে মিডিয়া স্বাধীন এবং সত্য উদ্ঘাটনে ও তা রিপোর্ট করার প্রতি দায়িত্বশীল। ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীগুলো যেভাবে দেখাতে চায়, মিডিয়া কেবল সেভাবেই বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। শুধু তথ্য, বিনোদন ও শিক্ষা দিয়েই নয়; বরং এই তিনটি কাজের মাধ্যমে বলীয়ান হয়ে গণমাধ্যম এখন মানুষের মতামতকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

বাংলাদেশে গণমাধ্যম গুলোর প্রচালিত টোক শো গুলোতে ডাকা হচ্ছে তথা কথিত বুদ্ধিজীবীদের যারা তথ্যের বিকৃতি সহ বিভিন্ন ভুল বক্তব্য দিচ্ছি। যা সাম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের একটি ভাইরাল টোক শো তে প্রতিয়মান হয়েছে। সালাম ও আল্লাহ হাফেজের সাথে নাকি জঙ্গিত্ত্ববাদের সম্পর্ক আছে।

এখনতো আবার মূলধারার গণমাধ্যমের অডিয়ান্সকে পরোক্ষ ভাবে বিক্রি করা হয় বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন নয়, যেন বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে অনুষ্ঠান দেখতেই বেশি অভ্যস্ত আমরা।

বিজ্ঞাপনের ভুল বার্তা বা মিথ্যা তথ্যের নেতিবাচক প্রভাব পরছে সমাজে। এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের চারপাশে রয়েছে৷ মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অগুণতি ভুল বার্তা আমরা প্রতিনিয়ত বিজ্ঞাপন থেকে হজম করছি৷

যেমনঃ একটা মেয়েকে ভালো বিয়ে থেকে শুরু করে ভালো চাকরি, সবকিছুর জন্য ফর্সা হতে হবে৷ শ্যামবর্ণের মেয়েদের কপালে চাকরিও নেই – বিজ্ঞাপনের এমন ধারণা চোখ বুজে বিশ্বাস করে আমরা আয়ুর্বেদিক থেকে শুরু করে টিউবলাইট-লেজারলাইট ফর্মুলাযুক্ত রং ফর্সাকারী ক্রিম নিজে মাখছি, অন্যকে মাখার পরামর্শ দিচ্ছি৷

শুধু টেলিভিশনেই না, বর্তমানে পত্রিকাগুলোর সামনের-পেছনের পৃষ্ঠায় আর অনলাইনের তো কথাই নেই৷ ওয়েবসাইটের মূল আধেয়র চারিদিকে থাকার পাশাপাশি যেখান সেখান দিয়ে হুট করে হাজির হচ্ছে বিজ্ঞাপন৷মাঝে মাঝে তো বিজ্ঞাপনের অভিনব কৌশলে সংবাদ থেকে তাকে আলাদা করতেও বিপাকে পড়তে হয়৷

স্থূলতা মানেই হাস্যকর, অপমানজনক – নিজের পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে এমন বার্তা দেয়া বিজ্ঞাপনকে হাস্যরসের ছলে স্বাগত জানাচ্ছি আমরা৷ এর মধ্য দিয়ে দিনকে দিন বর্ণবাদ ও বাহ্যিক রূপকে যোগ্যতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমরা ‘এগিয়ে’ চলেছি৷

আবার অন্যদিকে বেশকিছু অনুষ্ঠানে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপিত বার্তাগুলো আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, আমাদের আবেগ আর বিবেককে আলোড়িত করে৷
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি টেলিকম কোম্পানির বিজ্ঞাপনে শাশুড়িকে পুত্রবধূর স্কুটি শেখানো বা মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন কিনে নিয়ে যাওয়ার কথা৷ অথবা স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাটির প্রিয় ললিপপটি পথশিশুকে দেয়ার গল্পটা৷ চুলের তেল বিক্রয়কারী একটি প্রতিষ্ঠানের নারী দিবস উপলক্ষে নির্যাতনবিরোধী সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনটি দেশ ছাড়িয়ে সমাদৃত হয়েছে বিশ্ব অঙ্গনে৷ ‘আর এক চুলও ছাড় নয়’ স্লোগানের বিজ্ঞাপনটি স্তব্ধ করে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে৷

সম্প্রতিকালে দেখা যাচ্ছে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের মালিক৷ এসব গণমাধ্যমের নির্বাচনি সংবাদ প্রকাশ কতটা বস্তুনিষ্ঠ এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত হবে, সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷ অতীতেও বাংলাদেশের সংবাদপত্র মালিক বা সম্পাদকের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বেশ কিছু উদাহরন আছে৷ দেশের শীর্ষ স্থানীয় সংবাদপত্র ইত্তেফাকের প্রকাশক ও সাবেক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু’র মন্ত্রীত্বও দেখেছে এবং দেখছে বাংলাদেশের জনগণ৷ গাজী টেলিভিশনে সরকারি দলের বিজ্ঞাপন ও তাদের কিছু কন্টেন্ট দেখা গেছে, যেটি সরকারপক্ষীয়৷” তাদের কিছু প্রকাশিত সংবাদেও পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট লক্ষ্য করা গেছে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে সংঘাত, সহিংসতা বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় সেই সত্যের চেতনার মৃত্যু বা ধ্বংসের যে সাংবাদিকতা আমরা দেখেছি, তা ওয়াচডগ সাংবাদিকতার পরিবর্তে বিভ্রান্তিমূলক সাংবাদিকতার জন্ম দিয়েছে।

লেখক : শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।  

বিডপ্রেস এজেন্সি/টিডিএস/আই

আরও পড়ুন...