বর্তমান সাংবাদিকতায় যোগ্যতা লেখাপড়া অভিজ্ঞতার চেয়ে ‘আনুগত্য’ বড়!

জসিম উদ্দিন খান: দেশ ও সমাজের প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ বা অন্য পেশাজীবীরা যা করতে পারেন না সাংবাদিকেরা তা পারেন। অর্থাৎ সাংবাদিকদের হাতে রয়েছে অনেক ক্ষমতা। সাংবাদিকতা একটা নীতি নৈতিকতা বোধ সম্পন্ন পেশা, যা মর্যাদাসম্পন্ন। সাংবাদিকরা বিপদে মানুষকে সাহায্য করতে পারেন, পারেন সমাজের যে কোন অন্যায় অসংগতির প্রতিবাদ করতে। আর এসব কারণেই ছোটবেলা থেকে আমার সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়েই পড়াশুনা করেছি। পড়ালেখা শেষ করে বাস্তব জীবনে কাজ করতে এসে অনেক কিছুই চিন্তার সাথে মিলাতে পারছিলাম না। অনেক চড়াই উৎড়াই পেড়িয়ে একসময় আনুষ্ঠানিকভাবে পেশা বদল করলাম। তবে সাংবাদিকতা একে বারেই ছেড়ে দিইনি।

আজ এ লেখায় আমার প্রিয় সাংবাদিকতা নিয়েই কিছু কথা বলবো। এসব আমার নিজস্ব ভাবনা, কাউকে আঘাত করতে নয়। গুরুত্বপূর্ণ এ পেশার কিছু অসংঘতি, আশার নিরাশার কথাই তুলে ধরবো এখানে।

আমার কাছে মনে হয়েছে, বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকার সাংবাদিকতা কারা করে এবং কারা নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেয় এ প্রশ্নটার একটা সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ সাংবাদিকদের মর্যাদার কারণেই এর একটা দিক-নির্দেশনা থাকা দরকার। পাশাপাশি সাংবাদিকদের অসংখ্য সংগঠন বানানোর ব্যাপারেও একটা নীতিমালা দরকার।

যারা এই মুহূর্তে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, অনলাইন পোর্টালে, টেলিভিশন ও টেলিভিশনে সংবাদ বা ছবি সংগ্রহ, সংবাদ বা ছবি প্রক্রিয়াকরণ এবং অন্যান্য সাপোর্ট সার্ভিস প্রদান করেন- তারা সবাই কি সাংবাদিক? আবার এসব সংবাদ মাধ্যমে যারা মফস্বলে সংবাদ বা বিজ্ঞাপন সংগ্রহের কাজ করে থাকেন তারাও কি সাংবাদিক?

জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটি, সাংবাদিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বিটের কয়েক ডজন সাংবাদিক সংগঠন এবং নতুন যোগ হয়েছে বিভাগ ও জেলা কেন্দ্রিক কয়েক ডজন সংগঠনের ৫ থেকে ৭ হাজার সদস্য এরাই কি সবাই সাংবাদিক?

এবার যদি একটু বলি এসব সাংবাদিক সংগঠনের কাজ কী? তরুণ সাংবাদিক সাগর সারোয়ার এবং মেহেরুন রুনী হত্যার বিচার আদায়ে এসব সংগঠনের ভূমিকা কি ছিল? সাংবাদিকদের স্বার্থ সংরক্ষণেই বা এসব সংগঠন কি করেছে? সদস্যদের পেশাগত মান উন্নয়নে এসব সংগঠন কী করে? আমার প্রশ্ন হচ্ছে- যদি এসব সংগঠনের সে ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা নাই থাকে তাহলে প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

সরকার সাংবাদিকদের বেতন বাড়াতে সম্প্রতি একটি ওয়েজবোর্ড ঘোষণা করলেও গুটিকয়েক মালিক ও সম্পাদকের প্রচেষ্টায় মাসের পর মাস সেটা স্থগিত রয়েছে।

আবার এমন প্রশ্নও করা যেতে পারে যে- ঢাকার কয়জন সাংবাদিক ওয়েজবোর্ডের আওতায় বেতন পান? ঢাকার কয়টি পত্রিকা ওয়েজ বোর্ডের আওতায় বেতন দেওয়া হয়? সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা কি?

এসব প্রশ্নের উত্তর যদি নাই দিতে পারেন, তাহলে এসব সংগঠনের দরকার কি? তাদের আসলে কাজ কি? তারা কি কেবল বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে চাঁদাবাজি করে সাংবাদিকদের সুনাম নষ্ট করতেই সংগঠন গড়ে তুলেছেন?

এখন আর দেশে কোন প্রথিতযশা সাংবাদিক জাতির, সমাজের অভিভাবক হিসেবে গড়ে উঠছে না। কিন্তু কেনো? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।

দোকানের সাংবাদিক বনাম সাংবাদিকের দোকান :

দেশে অর্থনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য বড় হচ্ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনসহ অনলাইনের সংখ্যা। তবে সাংবাদিকতার মান কতটুকু বেড়েছে? এর ব্যাখা নাই দিলাম। একটা কথা বলা প্রয়োজন- সাংবাদিকদের সংগঠন বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে।

দু’একটি ছাড়া এসব সংগঠন কেন হচ্ছে? কারা করছে? কাদের স্বার্থরক্ষা করছে? সেটা সবাই অবগত। মানুষ সাংবাদিকদের এসব সংগঠনকে বলে দোকান। অর্থাৎ কয়েকজন সাংবাদিক একসঙ্গে মিলে খুলে ফেলছে একেকটি দোকান। তারপর এদের করতে হবে পিকনিক বা জমকালো কোন অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান করতে এবং খাওয়া-দাওয়া, পুরস্কার দিতে অনেক টাকা লাগবে। সহজ পদ্ধতি, নেমে পড়বে চাঁদাবাজিতে। আর এ জন্যই অনেকে মজা করে বলেন, সাংবাদিকের দোকান বা দোকানের সাংবাদিক। মজার ব্যাপার হচ্ছে এসব সংগঠনের সকল সদস্যদের কমন স্লোগান ‘আমাদের প্রাণের সংগঠন’। অর্থাৎ ডিআরইউ, প্রেসক্লাব থেকে শুরু করে তাদের দোকান সব সংগঠন প্রাণের সংগঠন। আবার এসব সংগঠন করতে গিয়ে ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে মিল না হলেই আবার আর একটি ‍নতুন সংগঠনের জন্ম দেয়া হবে। তারপর আরেকদল হলো নির্বাচনী সম্প্রদায়। অর্থাৎ ক্যারিয়ার নয় বিভিন্ন সংগঠনের নির্বাচন করে বেড়ানোই যেন তাদের একমাত্র ও অন্যতম কর্তব্য। এখন সময় এসেছে ভাবার। এসব দোকান কী পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা বাড়ায়, নাকি মর্যাদা হারায়?

এ কথা এখন পরিস্কার, একশ্রেণীর সাংবাদিক বিভিন্ন উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে চাঁদাবাজী করছে। এসব নেতা বা প্রভাবশালী সাংবাদিকদের এখন ঢাকায় বাড়ী, গাড়ীসহ অনেক সম্পদ। অপরদিকে দীর্ঘ সময় ওয়েজবোর্ডের আওতায় চাকুরি করেও বেশিরভাগ সাংবাদিকই তেমন কোন কিছুই করতে পারেনি।

সিনিয়র সাংবাদিক নেতাদের এসব অনিয়ম, অমিল নিয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তাদের ভাবতে হবে একজন পেশাজীবীর সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে কি কি যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন? কেবল কোন সংবাদ মাধ্যমে কাজ করলেই কি সে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিবে? সাংবাদিকতা পেশায় যারা আসেন তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কি হওয়া প্রয়োজন? আমরা জানি- প্রথম শ্রেণীর ১০/১৪টি বাংলা ও ইংরেজী সংবাদপত্র, কয়েকটি টেলিভিশন, তাদের প্রতিষ্ঠানে স্টাফ রিপোর্টার/সাব এডিটর হিসেবে ঢাকায় কাজ করতে আজকাল শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু এখনো বেশিরভাগ সংবাদ মাধ্যমে স্টাফ রিপোর্টার বা সাব এডিটর হিসেবে কাজ করতে কোন মিনিমাম যোগ্যতা প্রয়োজন হয় না। টেলিভিশনে তো বুম ধরতে পারলেই হলো। আর অনলাইনে কাট পেস্টই যথেষ্ট। অর্থাৎ কম্পিউটার জানলেই হয়ে যায়।

বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, যে কোন ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা একটি টেলিভিশন চ্যানেল, একটি অনলাইন খুলে যে কোন যোগ্যতার একজনকে বিভিন্ন পদে বসিয়ে দিতে পারেন। তার যোগ্যতা লেখাপড়া বা অভিজ্ঞতার চেয়েও বড় দরকার তার আনুগত্য। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকলেও সে সাংবাদিক হয়ে গেলো। কিন্তু অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনে এটা সম্ভব না। যেমন কেউ যদি আইনজীবী হন তাহলে আইন পেশায় কাজ করতে বার কাউন্সিলে পরীক্ষা দিয়ে পাস করে প্রাকটিস করতে হবে। আবার কেউ যদি ডাক্তার হন তবে তাকে একটি পেশাজীবী সার্টিফিকেশন নেয়ার ফলে নিজেকে সমাজে ডাক্তার পরিচয় দিতে পারবে। ইঞ্জিনিয়ার হলে আইইবি’এর সনদ পেলে সমাজে ইঞ্জিনিয়ার পরিচয় দিতে পারবে বা নামের পাশে ইঞ্জিনিয়ার টাইটেল ব্যবহার করতে পারবেন।

বাংলাদেশে একমাত্র সাংবাদিকতা পেশায় সাংবাদিক পরিচয় দিতে কোন সার্টিফিকেশন বা সনদ প্রয়োজন হয় না। এর ফলে যে কোন মানের লোকজন এ পেশায় আসছে। আবার সাংবাদিক না হয়েও কখনো সাংবাদিকতা না করেও এখন অনেকে সাংবাদিক নেতা। অর্থের দাপটে, ক্ষমতার দাপটে তারা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। যেখানে পেশাদার সাংবাদিক বঞ্চিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পরপরই অনেক চিহ্নিত রাজাকার পেশায় এসে সম্পাদক হয়েছে, আবার রাজনীতিও করেছে। এখনো বর্তমান প্রজন্মের অনেক সাংবাদিক যারা জামায়াত শিবির রাজনীতির সাথে সরাসরী সম্পর্ক আছে, তারা পরিচয় গোপন করে অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সেজে সাংবাদিকতা করছে। সাংবাদিকতায় সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা নেই বলে এটা সম্ভব হচ্ছে।

মফস্বল সাংবাদিকদের দিকে তাকালে আরো বেহাল অবস্থা। মফস্বল সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব বাড়ালেও সেখানকার ভালোমন্দ বা নীতি আদর্শ দেখার কেউ নেই। যার ফলে চলছে যে যার মত। বেশিরভাগ সংবাদপত্র বা টেলিভিশন বিভাগীয় শহর ছাড়া বেতন ভাতা দেন না। অধিকাংশ জেলা শহরগুলোতে সাংবাদিকদের কোন বেতন দেওয়া হয় না। কিন্তু সাংবাদিকরা নিজেদের মত করে এ পেশাটাকে একটা মহান চাঁদাবাজী পেশায় রপান্তরিত করেছে।

সময় এসেছে এসবের পরিবর্তনের। সাংবাদিকতা পেশায় সাংবাদিক কারা তা চিহ্নিত করা হোক। এটাকে একটি অন্যান্য বিশেষায়িত পেশার মত সনদ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হোক। যারা কোন দিন ওয়েজবোর্ডের আওতায় বেতন পাননি বা সাংবাদিকতা করে জীবিকা নির্বাহ করেননি, এমন সাংবাদিকদের ইউনিয়ন নেতা বানানো বন্ধ হোক। নেতা হওয়ার স্বার্থে তথাকথিত আন্ডারগ্রাউন্ড সাংবাদিকদের আর পুশবেন কিনা তা ঠিক করুন। তা না হলে সাংবাদিকদের সামনে আরো কঠিন বিপদ অপক্ষো করছে।

লেখক : সাবেক বিশেষ সংবাদদাতা -ফিনানসিয়াল এক্সপ্রেস, দ্যা ইন্ডিপেন্ডেন্ট, সাবেক সিনিয়র রিপোর্টার-দি ডেইলী স্টার, বাসস, সাবেক দপ্তর সম্পাদক- ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট ফেলো, ওয়েস্ট লন্ডন ইউনিভার্সিটি।

বিডিপ্রেস এজেন্সি/টিআই

আরও পড়ুন...