পি কে হালদারের পকেটে ঋণের ৮৪ শতাংশ

বিডিপ্রেস এজেন্সি : ২০১৫–২০১৭ সালের মধ্যে বিভিন্ন নামে ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়। যার ১ হাজার ১৮১ কোটি টাকারই সুবিধাভোগী পি কে হালদার।শেয়ারবাজারের কোম্পানি এফএএস ফাইন্যান্সের ২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা।২০১৩ সাল থেকে রেপটাইল ফার্ম, পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, সিমটেক্স, ডিজাইন অ্যান্ড সোর্স প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত হয়।২০১২ সাল পর্যন্ত ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের একক নিয়ন্ত্রণে ছিল নিটল-নিলয় গ্রুপ। গ্রুপের মালিকের পরিবারের সদস্য ও তাঁদের বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ছিলেন এফএএস ফাইন্যান্সের পরিচালনা পর্ষদে। তখন সেটি ভালো মানের আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল।

২০১৭ সালে পুরো প্রতিষ্ঠানটি চলে যায় আর্থিক খাতের আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের হাতে। এরপর পি কে হালদারের সমর্থনে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় যুক্ত হয় সিমটেক্স ও ডিজাইন অ্যান্ড সোর্স নামের আরও দুটি প্রতিষ্ঠান। এরপর শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির অর্থ লুটপাটের পালা।

কিন্তু ২০১৩ সালে শেয়ারবাজার থেকে শেয়ার কিনে এফএএস ফাইন্যান্সের পর্ষদে যুক্ত হতে শুরু করে পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল ও রেপটাইল ফার্ম নামের দুই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। আর নিটল-নিলয় গ্রুপ প্রতিষ্ঠানটি ছাড়তে শুরু করে। এরই এক পর্যায়ে ২০১৭ সালে পুরো প্রতিষ্ঠানটি চলে যায় আর্থিক খাতের আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের হাতে।এরপর পি কে হালদারের সমর্থনে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় যুক্ত হয় সিমটেক্স ও ডিজাইন অ্যান্ড সোর্স নামের আরও দুটি প্রতিষ্ঠান। এরপর শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির অর্থ লুটপাটের পালা। নামে-বেনামে বের করা হয় প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যার বড় অংশেরই সুবিধাভোগী পি কে হালদার। ঋণের নামে বের করে নেওয়া এসব অর্থ এখন আর ফেরত আসছে না। প্রতিষ্ঠানটির আমানতকারীরাও তাঁদের আমানত ফেরত পাচ্ছেন না।

 শেয়ারবাজারের কোম্পানি এফএএস ফাইন্যান্সের ২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। মোট ঋণের মধ্য থেকে ১ হাজার ১৮১ কোটি টাকা তথা ৮৪ শতাংশেরই সুবিধাভোগী পি কে হালদার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এসেছে, ২০১৫–২০১৭ সালের মধ্যে বিভিন্ন নামে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ১৮১ কোটি টাকার সুবিধাভোগী পি কে হালদার একাই।শেয়ারবাজারের কোম্পানি এফএএস ফাইন্যান্সের ২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। মোট ঋণের মধ্য থেকে ১ হাজার ১৮১ কোটি টাকা তথা ৮৪ শতাংশেরই সুবিধাভোগী পি কে হালদার। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের ৮৪ শতাংশই গেছে পি কে হালদারের পকেটে।

জানতে চাইলে নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ ৩ অক্টোবর প্রথম বলেন, চক্রটি পুরো পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি লুট করেছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছাকৃত তাদের সমর্থন দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব জানে, প্রতিষ্ঠানটিকে কারা এ পর্যায়ে নিয়ে গেল। পি কে হালদার দখলের আগে আবদুল মাতলুব আহমাদ দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন।

এভাবে ২০১৭ সালে এফএএস ফাইন্যান্স পুরোপুরি পি কে হালদারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বর্তমানে পুরো প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণ করছেন পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল ও রেপটাইল ফার্মের প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে রেপটাইল ফার্মের হাতে রয়েছে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ শেয়ার, আর পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনালের হাতে রয়েছে ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ শেয়ার। আবার রেপটাইলের মালিকানায় আছে পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল ও ব্রোকারেজ হাউস কেএইচবি সিকিউরিটিজের এমডি রাজীব সোম ও তাঁর স্ত্রী শিমু রায়।জানতে চাইলে রাজীব সোম বলেন, ‘রেপটাইল ফার্মে আমার ৩ শতাংশ শেয়ার। ফার্মের কার্যক্রমের বাইরে আমি কিছু জানি না।’

ঋণ যাদের নামে

এফএএস ফাইন্যান্স থেকে বিআর ইন্টারন্যাশনালের নামে ৭৩ কোটি টাকা, হাল ইন্টারন্যাশনালের নামে ৩৭ কোটি টাকা ও নেচার এন্টারপ্রাইজের নামে ৪০ কোটি টাকা বের করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে অপর আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকেও অর্থ বের করা হয়। তিনটি প্রতিষ্ঠানই ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের শেয়ারধারী। আর একসময় পি কে হালদার ছিলেন ইন্টারন্যাশনালেরও চেয়ারম্যান।

এর বাইরে আনন কেমিক্যালের নামে ৬২ কোটি, আর্থস্কোপ লিমিটেডের নামে ৪২ কোটি, সন্দ্বীপ করপোরেশনের নামে ৭১ কোটি, ড্রাইনুন অ্যাপারেলসের নামে ৭৭ কোটি, বর্নার নামের এক প্রতিষ্ঠানের নামে ৬৮ কোটি, এসএ এন্টারপ্রাইজের নামে ৭৩ কোটি, আরবি এন্টারপ্রাইজের নামে ৭১ কোটি, এমটিবি মেরিনের নামে ৪৯ কোটি, সুখাদা প্রপার্টিজের নামে ৬০ কোটি, অ্যান্ড বি ট্রেডিংয়ের নামে ৭৭ কোটি, জিঅ্যান্ডজি এন্টারপ্রাইজের নামে ৮০ কোটি, মুন এন্টারপ্রাইজের নামে ৬১ কোটি, কণিকা এন্টারপ্রাইজের নামে ৫৪ কোটি, সিগমা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের নামে ৭০ কোটি টাকা, উইন্টেল ইন্টারন্যাশনালের নামে ৪৫ কোটি টাকা ও অবন্তিকা বড়ালের নামে দেড় কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়।

আমরা চেষ্টা করছি অনাদায়ি ঋণ আদায়ের। বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টাও চলছে। তবে কে কীভাবে এত টাকা নিয়েছে, সবকিছু আমি জানি না। তিনি (পি কে হালদার) ফিরে আসলে কিছু একটা হতে পারে

জানতে চাইলে এফএএস ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রীতিশ কুমার সরকার গত বুধবার বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি অনাদায়ি ঋণ আদায়ের। বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টাও চলছে। তবে কে কীভাবে এত টাকা নিয়েছে, সবকিছু আমি জানি না। তিনি (পি কে হালদার) ফিরে আসলে কিছু একটা হতে পারে।’

জানা যায়, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে–পরে মিলিয়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) শেয়ার নামে–বেনামে কিনে প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নেন পি কে হালদার। এ চার প্রতিষ্ঠানের একটি এখন বিলুপ্তির পথে, বাকি তিনটিও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, পি কে হালদার কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁর একার পক্ষে এত বড় অপরাধ করা সম্ভব না। নিশ্চয়ই আরও বড় কেউ এর সঙ্গে জড়িত। সবাইকে বিচারের আওতায় আনা দরকার।

বিডিপ্রেস এজেন্সি/আই

আরও পড়ুন...