তথ্য এবং গণমাধ্যম | বিডিপ্রেস এজেন্সি

ছবি : বিডিপ্রেস এজেন্সি।

তামীমদারী সৌমিক : বাংলাদেশের মানুষ মিথ্যাকে যত দ্রুত গ্রহণ করে, সত্যকে তত নয়। এর কারণ হয়তো এই— বাঙালি আবহমান কাল থেকেই গল্পপ্রিয়। সুপ্রাচীনকাল থেকেই রূপকথা-উপকথা শুনে-শুনে এই তার মানসগঠিত হয়েছে। এসব কাহিনীর পরতে পরতে যত অ্যাডভেঞ্চার-রোমান্স লুকিয়ে থাকে, একটি নিরেট সত্যবাক্যে তার লেশমাত্রও থাকে না। নিরেট রসহীন-রুঢ় সত্য বেশিরভাগই হজম করতে পারে না। কারণ, তার কাছে ‘যতপ্রিয় মোহন মিথ্যারা, সত্য তত প্রিয় নয়।’ এই মোহনমিথ্যার ফাঁদে পড়েই অধিকাংশ নাগরিক আজ বিভ্রান্ত। আর এই বিভ্রান্তির পালে নতুন করে হাওয়া দিচ্ছে ফেসবুক

ফেসবুক ব্যক্তির ইচ্ছাধিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুক অ্যাকাউন্টধারীর কোনো পোস্ট অন্য কারও সম্পাদনার অধিকার নেই। আইডি যার, ইচ্ছাও তার। ফলে সেখানে যখন যা খুশি ব্যক্তি লিখতে পারে। এ যেন ‘পাগলার হাতে কুঠার’ দেওয়ার মতো ব্যাপার! পাগলা হাতে কুঠার পেলো তো, ‘ফলদ-বনজ’— যেই গাছই সামনে পড়ুক, তাতেই কোপ বসাবে।

এই নির্বিচারে গাছকাটা পাগল যেমন নির্দয় বিবেকহীন, তেমনি কাণ্ডজ্ঞানহীন সমাজের অধিকাংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা। তারাও কখনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে, কখনো বা অন্যের মাধ্যমে প্ররোচিত হয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ায়। কখনো আবার ‘ভুয়া-বানোয়াট’ তথ্য ছড়ায় না বুঝেই।

সাম্প্রতি গুজব ছড়ানোর পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে সবার আগে তথ্য পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা।

কোনো একটি ‘বিশেষ তথ্য’ সবার আগে জানানোর প্রতিযোগিতার মনোভাব। ওই মুহূর্তে গুজব ছড়ানো ব্যক্তির একমাত্র লক্ষ্যই থাকে— সবার আগে তার তথ্য ‘রাষ্ট্র’ করে দেওয়ার। আর এই সবার আগে তথ্য জানিয়ে দেওয়ার ভেতর এক ধরনের হিরোইজমও কাজ করে। ফলে ঘটনার সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের সুযোগ নেয় না ওই ব্যক্তি। এছাড়া, কিছু গুজব রটনাকারী অন্যের মাধ্যমেও প্ররোচিত হয়।

তারা জানতেও চায় না, নিজ-নিজ টাইমলাইনে যা প্রচার করছে, তার আদৌ কোনো ভিত্তি আছে কি না। তখন পূর্ববর্তী পোস্টদাতার মন রক্ষার্থেও ফেসবুকাররা যাছাই ছাড়াই তথ্য শেয়ার করতে থাকে। এতে কার মানহানি হলো, কার প্রাণ গেলো, তাতে ওই গুজব রটনাকারীদের কোনো মাথাব্যথা থাকে না। তারা বরং আড়ালে বসে, সমাজে কী পরিমাণ বিভ্রান্তি ছড়ালো, তার হিসাব কষতে বসে। একই সঙ্গে তাদের পোস্টের লাইক-কমেন্ট গুনতে থাকে।

এখন অনেকে নির্ভরযোগ্য সূত্র-গণমাধ্যমের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে। ফেসবুকে যা কিছুই পান, তাতে কোনো রকম সন্দেহপোষণ করেন না তারা। অমনি হামলে পড়েন। সেই তথ্য প্রচারের রীতিমতো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন সাম্প্রতি মুগদা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মুনতাসীর মামুন মারা গেছেন এমন গুজব কিছুদিন আগে ছড়িয়ে দেয় বেশ কয়েকজন রটনাকারী। আর ওই রটনাকারীদের গুজবে সাধারণ নাগরিক তো বিভ্রান্ত হয়েছেনই, সঙ্গে ওই ‘ভুয়া তথ্যযুক্ত’ পোস্টগুলো শেয়ার করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন খোদ গণমাধ্যমকর্মীদেরই কেউ কেউ। অথচ তারা চাইলেই সহজে মুগদা হাসপাতালে ফোন করে এই ইতিহাসবিদ-শিক্ষাবিদের খোঁজ-খবর নিতে পারতেন। হাতের কাছে নির্ভরযোগ্য সূত্র থাকার পরও তারা সেদিকে গেলেন না। গেলেন ফেসবুকের ভুয়া তথ্যে গা ভাসানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে।

আবার ঘটনা এখানেই শেষ নয় আওয়ামী লীগের এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া এবং তার একান্ত সহকারী জামাল উদ্দিন। এই দুজনের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমও সেই সংবাদ প্রকাশ করে। অথচ বিশ্বস্ত-দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর বরাতে প্রকাশিত ওই সংবাদের তোয়াক্কা না করে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি এমপি মোল্লার মৃত্যুসংবাদে ফেসবুকের টাইমলাইন ভাসিয়ে দিলেন। যদিও পরদিন সকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এসব ঘটনা পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় পরিষ্কার বোঝা যায় শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিচারে বেশিরভাগই নির্ভরযোগ্য সূত্র-দায়িত্বশীল মানুষের দেওয়া তথ্যের চেয়ে অসমর্থিত সূত্রের খবরে বেশি প্রলুব্ধ হয়। তারা একবারও খেয়াল করে না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সিংহভাগই গুজব।

তাদের এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভরতা একদিন ভয়ানক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। উল্টো তারা যুক্তির ডালা নিয়ে বসেন। তারা বলেন যে গণমাধ্যম তথ্য সেন্সর করে। কাটছাঁট করে। তাই ফেসবুক নাকি বিকল্প গণমাধ্যম হয়ে উঠেছে। এমন যুক্তি দেওয়ার সময় তারা ঘুণাক্ষরেও ভেবে দেখেন না— যেখানে জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা নেই, সেখান থেকে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য আসার সম্ভাবনাও অতি ক্ষীণ।

গুজব এমন কোনো বিবৃতি যার সত্যতা অল্প সময়ের মধ্যে অথবা কখনই নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। অনেকের দৃষ্টিভঙ্গিতে, গুজব হল প্রচারণার একটি উপসেট মাত্র। গুজব অনেক ক্ষেত্রে ভুল তথ্য এবং অসঙ্গত তথ্য এই দুই বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ভুল তথ্য বলতে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্যকে বুঝায় এবং অসঙ্গত তথ্য বলতে বুঝায় ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করা।

গুজবের তিনটি মৌলিক দিক আছে। প্রথমটি হল মানুষের মুখ। গুজব এক মুখ থেকে আরেক মুখে প্রচারিত হয়ে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সময় ও মানুষ- এ দুটি উপাদানের কারণে তা বিকৃতও হয় বিভিন্নভাবে। দ্বিতীয় দিকটি হল গুজবটি জ্ঞান প্রদান করে। বিষয়টি ভাবতে অবাক লাগতে পারে গুজব আবার কীভাবে জ্ঞান প্রদান করে। এর দুটো দিক থাকতে পারে। একটি হল ইতিবাচক আরেকটি হল নেতিবাচক। তৃতীয় দিকটি হল মানুষের মন গুজব দ্বারা প্রভাবিত হতে চায় ও গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এটাকে মাদকের আসক্তির মতো গুজবের আসক্তি বলা যায়।

বর্তমান সময়ে নেতিবাচক গুজব আমাদের সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এর ফলে মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। তবে কোনো একটি বিষয় বা ধারণাকে যাচাই করে তার সত্যতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মতো মনোভাব মানুষের মধ্যে সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ হতে পারে মানুষের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তার ভাবনা কোনো না কোনোভাবে অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আরেকটি বিষয় হল, কোনো একটি ঘটনার গভীরে প্রবেশ না করে মানুষের সেটিকে হালকাভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা।

ভুল তথ্য বা গুজব প্রতিরোধে ট্রিপল ফিল্টার টেস্ট’ করা যেতে পারে। যেখানে সত্য মিথ্যা নিয়ে,ভালো-মন্দ নিয়ে, উপকার-অপকার নিয়ে যাচাই করার সুযোগ থাকে।

‘সবার আগে তথ্য পৌঁছানোর প্রতিযোগিতা’ যাদের উদ্দেশ্য তাদের সংবাদ গ্রহনের ক্ষেত্রে ট্রিপল ফিল্টার টেস্ট করা উচিত। কোনো একটি তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে যদি আমরা তা ছড়াতে থাকি তবে সেটি যেমন আত্মঘাতী হতে পারে, তেমনি সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

গুজব সৃষ্টিকারীদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো— সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। সমাজ হানাহানিতে লিপ্ত হলে তারা পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে পারবে। কারণ এই গুজব সৃষ্টিকারীদের পারিবারিক-সামাজিক-শিক্ষাগত যোগ্যতার অতীত বর্তমান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে— তাদের অতীতে হয়তো ধোঁকাবাজি-প্রতারণা স্বভাব ছিল, নয়তো ছিনতাইয়ে মতো হীনকর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। মানুষে মানুষে ঝগড়া বাধিয়ে তারা ফায়দা লুটতো।

লেখক : শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।  

বিডিপ্রেস এজেন্সি/টিআই

আরও পড়ুন...