জননন্দিত মহানায়ক মাওলানা ভাসানী

ছবি : বিডিপ্রেস এজেন্সি।

মো: শরিফুল ইসলাম : মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার সয়াধানগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম চেগা মিয়া। তাঁর পিতার নাম হাজী শরাফত আলী খান। মাতার নাম মজিরন বিবি। তাঁর বড় ভাইয়ের নাম আমির আলী খান, ছোট ভাইয়ের নাম ইসমাইল খান, ছোট বোনের নাম কুলছুম বেগম। মওলানা ভাসানীর বয়স যখন মাত্র ০৬ (ছয়) বছর তখন তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর বয়স যখন ১২ বছর তখন কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর মা, দু’ভাই একমাত্র ছোট বোন মৃত্যুবরণ করেন। ১৩ বছর বয়সের সময় তিনি পীর নাসির উদ্দিন শাহ্ধসঢ়; বোগদাদীর সংস্পর্শে ময়মনসিংহ শহরের বাদেকল্পা গ্রামে চলে আসেন এবং পীর সাহেবের নিকট ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। এখানে তিনি আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি আসামে যান। সেখানেই তাঁর সংগ্রামী চেতনার বিকাশ ঘটে। আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯১৯ সালে দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জন দাসের আহ্বানে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগদান করেন।

কলকাতায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগদানের ফলে কারাবরণ করেন। এটাই তাঁর জীবনের প্রথম কারাবাস। আসামের ভাসান চরে ১৯২৪ সালে ঐতিহাসিক কৃষক প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এখানেই “মোঃ আব্দুল হামিদ খান” এর সাথে “ভাসানী” উপাধি দেয়া হয়। ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জন দাস ইহলোক ত্যাগ করলে মওলানা ভাসানী শোকে ভেঙ্গে পড়েন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ও চিন্তায় পরিবর্তন দেখা দেয়। ১৯২৫ সালের শেষের দিকে তিনি পাঁচবিবির জমিদার শামছুদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর কন্যা আলেমা খাতুনকে বিয়ে করেন। ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকার রোজগার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়।

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি। সামছুল হক সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেয়া হয়। নাম রাখা হয় আওয়ামীলীগ। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান হলেন সম্পাদক। ১৯৫৩ সালে যুক্ত ফ্রন্ট গঠিত হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্ত ফ্রন্ট ২২৮টি আসন লাভ করে।

১৯৫৪ সালের ২৭ মে জার্মানীর বার্লিনে শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য মওলানা ভাসানী লন্ডনে যান। পাকিস্তান সরকারের ষড়যন্ত্রে জার্মানীর ভিসা না পাওয়ায় তিনি শান্তি সম্মেলনে যোগদান করতে পারেননি। ১৯৫৭ সালে ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানকে আসসালামু আলাইকুম জানান। বৈদেশিক নীতি এবং স্বায়ত্ত্বশাসন বিষয়ে মতবিরোধের কারণে আওয়ামীলীগ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৫৭ সালের ২৬ জুলাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় হাসপাতালে থাকা অবস্থায় অসুস্থ্য মওলানা ভাসানীকে গ্রেফতার করা হয়।

তিনি বিনা কারণে ৪ বছর আটক ছিলেন ১৯৭১ সালের ৭ই জানুয়ারী স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্যে ৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর ৯ই মার্চ পল্টন ময়দানে মওলানা ভাসানী ঘোষণা করেন, সাত কোটি বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি বলেন “আমার তিনটি ছেলে তার মধ্যে শেখ মুজিব একটি।” তিনি আশা করেন, শিগগিরই ‘পূর্ব বাংলা’ স্বাধীন হবে।

এই জনসভায় মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর আস্থা জ্ঞাপনের জন্যে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ২১ শে মার্চ চট্টগ্রামের জনসভায় মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে আহ্বান জানান। মওলানা ভাসানী বলেন “শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বিশ্বের স্বাধীনতা প্রিয় জাতি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে।” ১৯৭১ সালের ১৬ই এপ্রিল মওলানা ভাসানী আসামে চলে যান।

প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ২৩শে এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে দীর্ঘ বিবৃতি প্রদান করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে আলোচনা করেন। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালের ২২শে জানুয়ারী মওলানা ভাসানী সিলেট সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর এবং ৭৫ সালের ৮ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মওলানা ভাসানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

সন্তোষে মওলানা ভাসানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় মওলানা ভাসানীর নামে করার প্রস্তাব বঙ্গবন্ধু উত্থাপন করলে সারা জীবন প্রচার বিমুখ মওলানা ভাসানী এ প্রস্তাবে রাজী হননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনকের হত্যাকান্ডে গভীর ভাবে মর্মাহত হন মওলানা ভাসানীর স্বাস্থ্য ক্রমশ অবনতির দিকে যেতে থাকায় ১৯৭৬ সালের ৪ নভেম্বর তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

১৩ নভেম্বর মওলানা ভাসানী সন্তোষে খোদাইখিদমতগার সম্মেলনে জীবনের সর্বশেষ ভাষণ দান করেন। ঐ দিনই হাসপাতালে ফিরে আসেন। এর চার দিন পর ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর রোজ বুধবার হাসপাতালের ৯ নম্বর কেবিনে রাত সাড়ে সাতটায় কিংবদন্তীয় মহানায়ক মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন।

সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় সন্তোষে ইসলামী বিশ্ব বিদ্যালয়ে মসজিদ প্রাঙ্গণে এই জন নন্দিত মহানায়ককে দাফন করা হয়। এখানেই তিনি চিরনিন্দ্রায় শায়িত আছেন। আমি তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁকে বেহেস্তবাসী করুন।

লেখক : সাবেক প্রধান শিক্ষক, বাজিতপুর হাফেজ আঃ রাজ্জাক পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়।

বিডিপ্রেস এজেন্সি/এনকে/এসআই

আরও পড়ুন...