কোভিড-১৯ মহামারীকালে বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের যে ৬টি উপায়ে সহযোগিতা করতে পারেন

ছবি : ইউনিসেফ বাংলাদেশ।

বিডিপ্রেস এজেন্সি ডেস্ক : করোনাভাইরাস রোগটি (কোভিড-১৯) উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চয়তার অনুভূতি নিয়ে আসে। বিশেষতঃ সকল বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রে এধরনের অনিশ্চয়তা আরও বেশি লক্ষ্য করা যায়। যদিও সকল শিশু এই জাতীয় আবেগকে বিভিন্ন উপায়ে মোকাবেলা করে, তবে আপনার সন্তান যদি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া, কোনও ইভেন্ট বা অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে যাওয়া বা বন্ধুদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনার মুখোমুখি হয়, তখন কিন্তু তারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভালবাসা এবং সহযোগিতার প্রয়োজন বোধ করবে।

“নিউ (অস্থায়ী)-নর্মাল” সময়ে বাড়িতে স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরিতে আপনি কীভাবে আপনার সন্তানদের সহায়তা করতে পারেন – এ বিষয়ে আমরা বিশেষজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী, সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের লেখক, মাসিক নিউ ইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট এবং দুই সন্তানের মা ডাঃ লিসা ডামুরের সাথে কথা বলেছি।

মহামারী চলাকালীন বাবা-মায়েরা কীভাবে তাদের সন্তানদের সহায়তা করতে পারেন –

১। শান্ত এবং সক্রিয় থাকতে হবে

ডাঃ ডামুর পরামর্শ দিয়ে বলেন, “করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) রোগ এবং নিজেকে এর থেকে সুস্থ থাকতে শিশুরা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সে বিষয়গুলো নিয়ে তাদের সাথে অভিভাবকদের অত্যন্ত শান্তভাবে কথাবার্তা বলা উচিত। সম্ভবত আপনি বা আপনার সন্তান কোনও একটা সময় প্রায়শই সাধারণ সর্দি বা জ্বরের মতো লক্ষণ অনুভব করতে পারেন। কিন্ত এতে তাদের অযথা আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। এ বিষয়টি তাদের জানানো উচিত।” তিনি আরও বলেন, “শিশুরা ভাল বোধ করছে না বা ভাইরাস সম্পর্কে উদ্বিগ্ন বোধ করছে – এ বিষয়টি বাবা-মাকে জানানোর জন্য শিশুদের উৎসাহিত করা উচিত যাতে করে অভিভাবকরা সন্তানদের সাহায্য করতে পারেন।”

ডাঃ ডামুর আরও বলেন. “কোভিড-১৯ রোগটি নিয়ে শিশুরা যে ভীত ও উদ্বিগ্ন বোধ করতে পারে প্রাপ্তবয়স্করা সে বিষয়টিকে সঠিক তথ্যের মাধ্যমে তাদের কাছে তুলে ধরে সহানুভূতি প্রকাশ করতে পারে।” তিনি বলেন, “বিশেষত শিশু ও অল্প বয়স্কদের ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ সংক্রমণজনিত অধিকাংশ উপসর্গই সাধারণত হাল্কা হয়। এ বিষয়ে আপনার সন্তানকে আশ্বস্ত করুন। এটা মনে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ যে, কোভিড-১৯ রোগের অধিকাংশ লক্ষণই চিকিৎসাযোগ্য। সেখান থেকে, আমরা তাদের মনে করিয়ে দিতে পারি যে, নিজেকে ও অন্যকে সুরক্ষিত রাখতে এবং পরিস্থিতির ওপর আরও ভাল নিয়ন্ত্রণ রাখতে আমরা ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, মুখমন্ডল স্পর্শ না করা এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো অনেক কিছুই করতে পারি।”

ডাঃ ডামুর বলেন, “আর একটি জিনিস যা আমরা করতে পারি তা হ’ল প্রকৃতপক্ষে আমরা তাদেরকে বাইরের অবস্থা অনুধাবন করতে সাহায্য করতে পারি। এটি করতে গিয়ে আমরা তাদেরকে বলতে পারি যে, ‘শোনো, আমরা জানি করোনাভাইরাস রোগে আক্রান্ত হওয়া নিয়ে তোমরা সত্যিই খুব উদ্বিগ্ন। তবে আমরা তোমাদের ঘন ঘন হাত ধোয়া, বাড়িতে থাকার মতো কিছু বিষয় অনুসরন করতে পরামর্শ দিয়েছি। এর কারণ হলো আমরা এভাবেই আমাদের কমিউনিটির সদস্যদের যত্ন নিই। আর এভাবেই আমরা আমাদের চারপাশের মানুষদের নিয়েও চিন্তা করি।”

২। একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলুন

ডাঃ ডামুর বলেন, “শিশু কিশোরদের জন্য একটা সময়সূচী বা রুটিন দরকার। খুব দ্রুততার সাথে আমাদেরকে এমন একটা রুটিন তৈরি করতে হবে যা আমাদের প্রত্যেকের সময়কে দিনের পর দিন কার্যকরভাবে ব্যয় করতে সাহায্য করবে। এবং তাই আমি দৃঢ়ভাবে সুপারিশ করব যে, দিনের একটি সময়সূচি আছে কিনা তা বাবা-মা নিশ্চিত করবেন। আর এ সময়সূচিতে সময়টা কীভাবে ব্যয় করা হবে তার পরিকল্পনা থাকবে। সময়সূচির এই পরিকল্পনার মধ্যে খেলার সময়ও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যেখানে তারা তাদের ইচ্ছানুযায়ী তাদের বন্ধুদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করতে পারে। এছাড়াও এই সময়সূচিতে প্রযুক্তি-মুক্ত সময় এবং বাড়ির কাজে সাহায্য করার সময়সূচিও অন্তর্ভূক্ত থাকা দরকার। কোন বিষয়গুলোকে আমাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত তা নিয়ে আমাদের চিন্তা করা উচিত এবং এমন একটি সময়সূচী তৈরি করা দরকার যেখানে এই বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত থাকবে। এছাড়াও, এরকম একটা পরিকল্পিত সময়সূচি তাদেরকে বুঝতে সাহায্য করবে কখন তারা কাজ করবে এবং কখন তারা খেলবে। এই দিকনির্দেশনা তাদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে আসবে।”

ডাঃ ডামুর এসব বিষয়গুলোতে আমাদের সন্তানদের সম্পৃক্ত করারও পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, “১০ এবং ১১ বা তার চেয়েও বেশি বয়সী শিশু-কিশোরদেরকে এটির পরিকল্পনা তৈরিতে অংশগ্রহন করতে বলবো। এবং এই সময়সূচিতে যেসব বিষয় থাকা উচিত সে সম্পর্কে তাকে ধারণা দিবো, এবং তারপর তারা যা তৈরি করলো সেটা নিয়ে কাজ করবো।” ছোট শিশুদের বিষয়ে তিনি বলেন, “কে তাদেরকে তদারকি করছে (আমরা জানি যে, প্রত্যেক বাবা-মা সব সময় বাড়িতে থাকেন না) তার উপর নির্ভর করে তাদের দিনের রুটিন তৈরি করতে হবে।

দিনের সময়সূচি এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে করে যদি কোন কিছু ঘটেও যায় তবে তার আগেই সকল কাজ যেমন, স্কুলের সকল কাজ, অন্যান্য সকল কাজ, যে কাজগুলো তাদের করতে হবে তা শেষ হয়ে যায়। কোন কোন পরিবারের ক্ষেত্রে, দিনের শুরুতে এ কাজগুলো করা শিশু-কিশোরদের জন্য সবচেয়ে ভাল হতে পারে। অনেক পরিবার মনে করতে পারে যে, দিনটি কিছুটা পরে শুরু করা ভাল হবে। আরেকটু ঘুমিয়ে নেয়া এবং পরিবারের সকলের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে সকালের নাস্তা করার পর দিনের অন্যান্য কাজ করা ভাল।” যেসব বাবা-মা দিনের বেলা তাদের সন্তানদের তদারকি করতে পারেন না, সেক্ষেত্রে তাদের তত্ত্বাবধায়ককারীদের সাথে কথা বলে সবচেয়ে কার্যকর হবে এমন একটি রুটিন তৈরির চেষ্টা করুন।

৩। আপনার সন্তানকে তার আবেগ অনুভব করতে দিন

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)-এর কারণে স্কুল বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে বাতিল হওয়া স্কুলের নাটক, কনসার্ট, বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং অন্যান্য বিভিন্ন কার্যক্রমের বাতিল হওয়ায় শিশুরা বেশ হতাশ। এক্ষেত্রে ডাঃ ডামুরের একটি পরামর্শ হ’ল তাদেরকে দুঃখ পেতে দেয়া উচিত। তিনি বলেন, “শিশু কিশোরদের জীবনে এগুলো বড় ধরনের ক্ষতি। এই ক্ষতি আমাদের চেয়ে তাদের জন্য অনেক বড়। কারণ, এটি আমরা আমাদের জীবনকাল এবং অভিজ্ঞতার আলোকে পরিমাপ করছি। যেসব ক্ষতির জন্য তারা শোক করছে, তার জন্য তারা খুব হতাশ। তাদের কাছ থেকে এরকম প্রতিক্রিয়াই আশা করুন, এটাকে স্বাভাবিক হিসাবে ধরে নিন এবং এক্ষেত্রে তাদেরকে সহায়তা করুন। যখন সন্দেহ থাকে, সেক্ষেত্রে সহানুভূতি দেখানো এবং সহযোগিতা করাই সামনে এগোনোর উপায়।

৪। তারা কী শুনছে তা নিয়ে তাদের সাথে কথা বলুন

করোনভাইরাস (কোভিড-১৯) রোগ সম্পর্কে প্রচুর ভুল তথ্য প্রচারিত হচ্ছে। আপনার সন্তান কী শুনেছে বা কোনটাকে তারা ইতিমধ্যে সত্য বলে মনে করেছে সেটা অনুসন্ধান করুন। কেবলমাত্র সত্য তথ্য দেওয়াই যথেষ্ট নয়। কারণ, আপনার সন্তান যদি ভুল কিছু জেনে থাকে সেক্ষেত্রে আপনি সরাসরি ভুল বোঝাবুঝির সমাধান করে গেলে তারা আপনার দেয়া নতুন তথ্যের সাথে তাদের কাছে থাকা পুরানো তথ্যকে মিলাবে। তাই তারা ইতিমধ্যে যা জেনেছে সেটা অনুসন্ধান করুন এবং তাদেরকে সঠিক তথ্যের কাছে নিয়ে আসার জন্য সেখান থেকে শুরু করুন।

তারা যদি এমন প্রশ্ন করে যার উত্তর আপনি জানেন না, সেক্ষেত্রে অনুমান করার পরিবর্তে উত্তরগুলোকে একসাথে অনুসন্ধান করার সুযোগ হিসাবে এটিকে ব্যবহার করুন। তথ্য পাবার সূত্র হিসাবে বিশ্বাসযোগ্য সংস্থার ওয়েবসাইট (যেমন, ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইট) ব্যবহার করুন।

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) রোগের সময় অনেক শিশু-কিশোর স্কুল বা অনলাইনে হয়রানী এবং নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আপনার সন্তান যদি হয়রানীর শিকার হয়, তবে আপনি সব সময় তাদের পাশে থাকবেন – এ বিষয়টা আপনার সন্তানদের জেনে রাখা জরুরি। ডাঃ ডামুর বলেন, “যে কোনও ধরণের অনলাইন হয়রানী মোকাবেলার সেরা উপায় হ’ল বাইন্ড্যান্ডারদের বা আশেপাশে থাকা লোকজনকে সক্রিয় করা। যেসব শিশু-কিশোররা হয়রানীর শিকার হচ্ছে, তাদের হয়রানীকারকদের মুখোমুখি না হয়ে বরং তাদের সাহায্য করতে পারে এমন কোনও প্রাপ্তবয়স্কের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।”

৫। শুরুতেই বাধা সৃষ্টি করুন 

যখন কঠিন আবেগ প্রক্রিয়াকরণের বিষয় আসে, সেসময় কী করা যায় সে সম্পর্কে ডাঃ ডামুর বলেন, “আপনার সন্তানের কাছ থেকে ইঙ্গিত নিন এবং সত্যিকারের বাধা-বিপত্তি খুঁজে পাওয়ার সাথে অনুভূতি সম্পর্কে কথা বলার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য অনেক চিন্তাভাবনা করুন এবং যখন তাদের মন খুব খারাপ থাকে তখন তাদের খারাপ লাগা থেকে মুক্তি দিতে বাধা-বিপত্তির বিষয়টি মেনে নিন।” কয়েকদিন পর পর পারিবারিক একটি খেলা খেলুন বা একসাথে খাবার রান্না করুন। ডাঃ ডামুর তার মেয়েদের সাথে যোগাযোগের জন্য রাতের খাবারের সময়টি ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, “প্রতি রাতে আমরা একটি ডিনার টিম বানাবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা আসলে এটাকে একটা জোড়া হিসাবে দাঁড় করাতে চাই। রাতের খাবারের দায়িত্বে কে থাকবে সেটার দায়িত্বকে আমরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিই।”

শিশু-কিশোর এবং তাদের ডিজিটাল পর্দা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা বিচ্যুতির সুযোগ দিন। তবে সুযোগটা যেন অবারিত না হয়। ডাঃ ডামুর নিজের সন্তানের সামনে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, তাদের হাতে আরও সময় আছে যা আপনি বুঝতে পেরেছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ করার সার্বক্ষণিক সুযোগ থাকা কোনোভাবেই ভাল হবে না। তিনি বলেন, “আপনার সন্তানকে জিজ্ঞাসা করুন, ‘কীভাবে আমাদের এটি মোকাবেলা করা উচিত? একটি সময়সূচী নিয়ে আসো এবং তুমি যে সময়সূচী সম্পর্কে ভাবছো তা আমাকে দেখাও এবং তারপরে আমি তোমাকে কী বলতে চাই তা জানাব”।

৬। আপনার নিজের আচরণ পর্যবেক্ষণ করুন

ডাঃ ডামুর ব্যাখ্যা করে বলেন, “অবশ্যই বাবা-মায়েরা বেশ উদ্বিগ্ন থাকে এবং আমাদের সন্তানেরা আমাদের কাছ থেকে সংবেদনশীল ইঙ্গিত আশা করবে।” আমি বাবা-মাকে উদ্বেগ সামলানোর জন্য এবং তাদের ভয়ের বিষয়টি সন্তানদের সাথে ভাগাভাগি না করতে বলবো। এর অর্থ হ’ল আবেগকে ধরে রাখা। বিশেষত বাবা-মা যদি সেই আবেগগুলোকে তীব্রভাবে অনুভব করে, তখন বাবা-মার পক্ষে আবেগকে ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।”

শিশু কিশোররা তাদের নিজেদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত ধারণা পাবার জন্য তাদের বাবা-মায়েদের উপর নির্ভর করে। ডাঃ ডামুরের মতে, “[এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ] আমাদের মনে রাখা উচিত যে, তারা গাড়ির যাত্রী এবং আমরা গাড়ি চালাচ্ছি। সে কারনে আমরা যদি উদ্বিগ্ন হই, তবে আমরা সন্তানদেরকে আমাদের গাড়ীতে নিরাপত্তা বোধ দিতে পারবো না।” তথ্যসূত্র- ইউনিসেফ বাংলাদেশ।

বিডিপ্রেস এজেন্সি/জান্নাতুল মুক্তা

আরও পড়ুন...